ঢাকার পাড়া-মহল্লায় এক সময় প্রচুর কাক দেখা যেত। গাছপালা, জলাশয় ও খোলা জায়গাজুড়ে ছিল নানা প্রজাতির পাখির বিচরণ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বৃক্ষনিধন ও জলাশয় ভরাটে সংকুচিত হয়েছে তাদের আবাসস্থল। নগরের আকাশে অন্য পাখির উপস্থিতি কমে আসার বিপরীতে গত দেড় থেকে দুই বছরে চোখে পড়ার মতো বেড়েছে ভুবন চিলের আনাগোনা। বিশেষ করে গত ছয় মাসে চানখাঁরপুল, রমনা, মতিঝিল, হাতিরঝিল, মাতুয়াইল ও আমিনবাজার এলাকায় বর্জ্যখেকো এ চিলের উপস্থিতি বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পাখি গবেষক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা।
চানখাঁরপুল এলাকায় মাস তিনেক আগেও একসঙ্গে পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ২০টি চিল দেখা যেত। গত ১৫ দিন ধরে সকালে চানখাঁরপুল, মতিঝিল ও গুলিস্তান এলাকায় শত শত চিলের ঝাঁক চোখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরজুড়ে উন্মুক্ত বর্জ্যের সহজলভ্যতা এ পাখির আনাগোনা বাড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে চিলের প্রকৃত সংখ্যা কতটা বেড়েছে, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত গণনা ও গবেষণা প্রয়োজন বলেও জানান তারা।
দীর্ঘদিন ধরে প্রাণীর অধিকার নিয়ে কাজ করছেন বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ফারজানা তাসনিম বর্ষা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘একটা সময় রাজধানীতে প্রচুর কাক ছিল। সবার অগোচরে নগরী থেকে কাকগুলো হারিয়ে গেছে। এখন ঢাকায় প্রচুর চিল দেখা যাচ্ছে। চিলের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারণ নিয়ে রাষ্ট্রীয়
উদ্যোগে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। বায়ুদূষণ, বৃক্ষনিধন ও জলাশয় কমে যাওয়ায় এ নগরীতে পাখি তো দূরের কথা, মানুষের বসবাসও কঠিন হয়ে পড়েছে।’ এমন পরিস্থিতিতে ভুবন চিল নিয়ে সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার দাবি তুলেছেন এ প্রাণী সুরক্ষাকর্মী।
পাখি গবেষকদের তথ্যমতে, বাংলাদেশে সাধারণত ভুবন চিল, শঙ্খ চিল ও সাদা চিল বা ধান চিল দেখা যায়। ঢাকায় বর্তমানে দৃশ্যমান চিলগুলোর অধিকাংশই ভুবন চিল। এরা আবাসিক পাখি হলেও খাদ্যের সন্ধানে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় বিচরণ করে। মৃত প্রাণী, মাছের উচ্ছিষ্ট ও পচা খাবারসহ বিভিন্ন উৎস থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে। নগরের ডাস্টবিন, বাজার ও বর্জ্যের ভাগাড় তাই তাদের জন্য সহজলভ্য খাদ্যের উৎস।
ভুবন চিলের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামান বলেন, ‘ইঁদুর, গৃহস্থালির পচা-মরা মাছ-মাংসের অবশিষ্টাংশ এবং জীবিত বা মৃত ছোট প্রাণী এদের খাদ্য। পচা প্রাণিজ খাদ্যও খায় বলে শহরের ডাস্টবিন ও ময়লার ভাগাড় থেকে খাবার সংগ্রহ করতে দেখা যায়। এ কারণে এ শিকারি পাখিকে প্রকৃতির ঝাড়ুদারও বলা হয়।’
অধ্যাপক ড. জামানের মতে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের যেসব বর্জ্যের ভাগাড় ঢাকার আশপাশে রয়েছে, সেসব ভাগাড়ে ভুবন চিলের আনাগোনা বেশি পরিলক্ষিত হয়। খাদ্যের অন্বেষণে চিলগুলো ঢাকা শহরের ভেতর থেকে, সাধারণত যেসব জায়গায় বড় বড় গাছ আছে, সেসব জায়গা থেকে আসে। সন্ধ্যার পরপরই চিলগুলো আবার গাছগুলোতে রাত্রিযাপনের জন্য ফিরে আসে। এ কারণে দিনে শহরে চিল কম দেখা যায়। তবে চিলের সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে না বেড়েছে, তা জানার জন্য দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

নগরজুড়ে উন্মুক্ত বর্জ্যের সহজলভ্যতায় চিলের আনাগোনা বেড়েছে
ঢাকার আকাশে হঠাৎ চিল বেশি দেখা যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো খাবারের অন্বেষণে বিশেষ কিছু জায়গায় ঢাকার আকাশে বেশ কিছু চিল দেখা যায়। তার অর্থ এই নয় যে ঢাকায় চিল বেড়েছে। বরং এটি সত্য যে ঢাকায় বড় বড় গাছ কমছে, বিশেষ করে চিলগুলো যেসব গাছে রাত্রিযাপন করে। জলাশয়ের ধারেও এ প্রজাতির পাখিগুলো খাবার খোঁজে। ঢাকা শহরের আশপাশেও জলাশয় ক্রমান্বয়ে কমছে। যদি জলাশয়ও না থাকে, তাহলে এ পাখিগুলো থাকবে কী করবে? সাধারণত ভুবন চিলগুলো খাবারের খোঁজে সকালবেলা বিভিন্ন দিকে উড়ে যায় এবং সারা দিন ঘুরে ফিরে খাবার খেয়ে বিকেলে আবার নগরীর বড় বড় গাছগুলোতে রাত্রিযাপনের জন্য ফিরে আসে। এটাও ঠিক যে খাবারের খোঁজে কিছু চিল নগরীতেও থেকে যায়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় চিলের প্রকৃত সংখ্যা, কাকসহ অন্যান্য পাখির হ্রাস এবং বর্জ্যের সঙ্গে এসব পরিবর্তনের সম্পর্ক নির্ধারণে নিয়মিত পাখি গণনা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা জরুরি। পাশাপাশি উন্মুক্ত বর্জ্য ফেলা বন্ধ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষ সংরক্ষণ ও জলাশয় রক্ষায় উদ্যোগ প্রয়োজন। নগরের আকাশে চিলের ঝাঁক বাড়তে দেখা গেলেও সেটি সুস্থ নগর বাস্তুতন্ত্রের প্রমাণ নয়; বরং পরিবর্তিত খাদ্য ব্যবস্থা ও আবাসস্থলের সংকটের একটি ইঙ্গিত হতে পারে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাফিজ আশরাফুল হকও চিলের উপস্থিতির সঙ্গে উন্মুক্ত বর্জ্যের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘উন্নত দেশগুলো বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করছে। অথচ ঢাকায় সড়ক, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকার পাশে খোলা বর্জ্য পড়ে থাকে। পরে সিটি করপোরেশন এসব বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে ডাম্পিং করে। কিন্তু বর্জ্য সম্পদে রূপান্তরের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।’
ভুবন চিল বর্জ্যভুক পাখি উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকায় চিলের উপস্থিতি বাড়ার একটি বড় কারণ হতে পারে উন্মুক্ত বর্জ্যের বিস্তার। তবে নগরের বাস্তুতন্ত্রে প্রাণীর সংখ্যা বাড়া-কমার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। বিষয়টি নিয়ে পৃথক গবেষণা প্রয়োজন।’
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের সূত্রে জানা যায়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে নগরীর সড়ক ও উন্মুক্ত স্থানে অন্তত ৩০ শতাংশ বর্জ্য পড়ে থাকছে। এছাড়া দীর্ঘদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযান না করার কারণে নগরীর বিদ্যমান খাল-জলাশয়গুলোও আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি নগরীর কাঁচাবাজার, ফলের বাজার, হাসপাতালের আশপাশে উৎপন্ন বর্জ্যও চিল, ইঁদুরের মতো বর্জ্যভুক প্রাণীর জন্য আদর্শ জায়গা হয়ে উঠেছে। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে বর্জ্যের সঙ্গে যেমন নতুন নতুন প্রাণী শহরে আসবে, একই সঙ্গে এসব মিশ্রিত বর্জ্য খেয়ে তারা অসুস্থও হয়ে পড়বে। বিশেষ করে ঢাকার বর্জ্যের সঙ্গে প্রচুর প্লাস্টিক, কেমিক্যাল থাকে। এসব শুধু প্রাণীদের জন্য নয়, মানুষের জন্যও ক্ষতিকর।
ভুবন চিলের বাসস্থান সম্পর্কে পাখি গবেষকরা বলেন, গাছের চেয়ে বেশি বাসা করে টাওয়ার, পানির ট্যাংকের তলায় বা ওপরে। এরা বছরের পর বছর একই জায়গায় বাসা করতে পছন্দ করে। সম্প্রতি ঢাকায় চিল বাড়ার ভিন্ন একটি কারণ সামনে এনেছেন বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক (বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল) মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় একসময় বর্জ্যভুক প্রাণী ছিল কাক। এখন বেশি দেখা যাচ্ছে ভুবন চিল। আমি যখন চানখাঁরপুল দিয়ে যাত্রাবাড়ী যাই তখন ঝাঁকে ঝাঁকে চিল দেখা যায়। এগুলো ভুবন চিল। এর বড় কারণ হলো ঢাকায় এখন কাক নেই।’
তার ব্যাখ্যা, কাক দলবদ্ধভাবে চিলের বাসার আশপাশে অবস্থান করে এবং ডিম ও বাচ্চার ক্ষতি করার চেষ্টা করে। ফলে কাকের উপস্থিতি কমে গেলে চিলের ডিম ও বাচ্চা তুলনামূলক নিরাপদ থাকতে পারে। এতে প্রজননের হার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ঢাকায় কাক কমে যাওয়ার সঙ্গে চিলের প্রজনন বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে গবেষণার প্রয়োজন।
ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, ‘ঢাকায় বড় গাছ ও জলাশয় কমে যাওয়ায় পাখিদের বসবাস কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েক বছর আগে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সময় আমরা প্রায় ২০০টি চিল উদ্ধার করে সুস্থ করেছিলাম। বর্তমানে যে চিল দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর বংশবৃদ্ধিও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।’
চিলের উপস্থিতি বাড়লেও নগরের পরিবেশ তাদের জন্য স্বাস্থ্যকর নয় বলে মনে করেন তিনি। উন্মুক্ত বর্জ্যে থাকা প্লাস্টিক, রাসায়নিক ও দূষিত খাবার পাখির স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বর্জ্য বাতাস ও পানির মাধ্যমে পরিবেশ দূষণও বাড়ায়, যার প্রভাব পড়ে মানুষের ওপরও।









