কাগজে-কলমে বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক রফতানির তথ্য আছে। একই সঙ্গে কাস্টমসের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হলেও বাস্তবে কনটেইনারে ১ কেজি পণ্যেরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। যেখানে থাকার কথা ছিল ১২১ টন পণ্য, যার কোনো অস্তিত্বই নেই। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড অনুসারে ৪ লাখ ৩৮ হাজার মার্কিন ডলারের রফতানি দেখানো হয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের বিশেষ তৎপরতায় ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেড নামে একটি বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি ভুয়া রফতানি চালান আটক করার মাধ্যমে এ চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি উন্মোচন করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি সার্ভার ও দাপ্তরিক নথিপত্রে ৪ লাখ ৩৮ হাজার মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকার পণ্য রফতানি দেখানো হয়। সংশ্লিষ্ট ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোতে বাস্তবে কোনো পণ্যের অস্তিত্ব ছিল না।
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে নিয়মিত রফতানি কনসাইনমেন্ট যাচাইকালে এ চালানগুলো কর্মকর্তাদের নজরে আসে।
প্রাথমিক বিশ্লেষণে রপ্তানির গন্তব্য দেশ, পণ্যের প্রকৃতি ও ঘোষিত ওজনের মধ্যে চরম অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। সাধারণত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান রফতানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র হলেও এই চালানের গন্তব্য হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফিলিপাইন উল্লেখ করা হয়, যা গোয়েন্দাদের মনে সন্দেহ তৈরি করে।
এছাড়া বন্ডেড প্রতিষ্ঠানটির বিগত এক বছরে আমদানিকৃত কাঁচামালের পরিমাণের তুলনায় এ ঘোষিত রফতানি পণ্যের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি পাওয়া যায়, যা নিয়ম অনুযায়ী ইনপুট-আউটপুট সহগের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নথিপত্র অনুযায়ী, পাঁচটি রফতানি চালানে মোট ঘোষিত পণ্যের ওজন ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ কেজি এবং ঘোষিত রপ্তানিমূল্য ছিল ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৩০৪ মার্কিন ডলার। বিল অব এক্সপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, পণ্যগুলো চট্টগ্রামের ইসাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো থেকে জাহাজীকরণ হওয়ার কথা ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে কাস্টমস গোয়েন্দার কর্মকর্তারা সরেজমিনে ওই ডিপোতে গিয়ে পণ্যগুলো পরীক্ষণের জন্য উপস্থাপনের নির্দেশ দিলে বেরিয়ে আসে মূল জালিয়াতি।
ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কর্মকর্তারা গোয়েন্দাদের সামনে কোনো পণ্যই প্রদর্শন করতে পারেননি। তারা স্বীকার করেন যে, রফতানির জন্য ঘোষিত এ ১২১ মেট্রিক টন পণ্যের কোনো অংশই কখনো ডিপোতে প্রবেশ করেনি।
পণ্য ডিপোতে প্রবেশ না করা সত্ত্বেও কীভাবে কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে রফতানির আনুষ্ঠানিকতা ও ছাড়পত্র সম্পন্ন হলো, তা নিয়ে কাস্টমস ও বন্দরসংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। পণ্য ছাড়াই রপ্তানি প্রদর্শনের এ অপচেষ্টা কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের নজরদারিতে প্রতিহত করা সম্ভব হলেও এর পেছনের মূল রহস্য উদঘাটনে গভীর অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ জালিয়াতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ডিপো কর্তৃপক্ষ কিংবা কাস্টমসের অভ্যন্তরীণ কোনো কর্মকর্তার যোগসাজশ বা অর্থ পাচারের উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন ও প্রচলিত অন্যান্য আইন অনুযায়ী কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।









