দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে এবং খাদ্যপণ্যের প্রায় শতভাগ উৎপাদন করে। ফলে গ্রামে মূল্যস্ফীতির চাপ কম থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যানে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। সংস্থাটির গতকাল প্রকাশিত আগস্টের মূল্যস্ফীতির তথ্যে দেখা যায় শহরের তুলনায় গ্রামে মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি, বিশেষ করে খাদ্য-বহির্ভূত খাতে। পোশাক, আসবাব, শিক্ষাসামগ্রী ও ইলেকট্রনিক পণ্যগুলো শহরের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে গ্রামে।
গত কয়েক বছরে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষের মাথাপিছু আয় কমেছে। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য হচ্ছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ায় সীমিত আয়ের মানুষকে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে সঞ্চয় কমছে, পাশাপাশি খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় পুনর্বিন্যাস করতে হচ্ছে।
গ্রামের উৎপাদিত পণ্য পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে হাতবদল হয়ে শহরে আসে। তবু গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকা উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শহরের তুলনায় গ্রামে আয় ও কর্মসংস্থান যেমন সীমিত, বিপরীতে শহরে সব পণ্যের দাম বেশি। শহরে খাদ্য-বহির্ভূত পণ্য সরবরাহ করতে পারলেও কৃষি, খাদ্য পণ্যের জন্য গ্রামের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সেখানে যদি গ্রামে মূল্যস্ফীতি বাড়ে তাহলে তা উদ্বেগজনক। গ্রামে মূল্যস্ফীতি বাড়লে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়।
বিবিএস প্রকাশিত আগস্টের ভোক্তা মূল্যসূচক ও মূল্যস্ফীতির হিসাবে দেখা যায়, ওই মাসে সার্বিক (পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে) মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে। এটি নয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
আগস্টে খাদ্যপণ্যের চেয়ে খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ওই মাসে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, যা জুলাইয়ের তুলনায় কিছুটা কম। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে। বছরের হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমলেও মাসিক ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির চাপ শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি। ছয় বছর ধরে এমন প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এর আগের বছরগুলোয় এ প্রবণতা স্বাভাবিক ছিল। অর্থাৎ শহরের চেয়ে গ্রামে মূল্যস্ফীতি কম ছিল।
চলতি বছরের আগস্টের হিসাবে গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩১ আর শহরে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। ওই মাসে গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক শূন্য ১ ও শহরে ৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত খাতে গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। আগস্টে গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৫৯ ও শহরে ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি বাড়লেও গ্রামে মানুষের মজুরি হার বাড়ছে না। বিবিএসের হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে অনুসারে শহরে মানুষের মাসিক মাথাপিছু গড় আয় ১০ হাজার ৯৫১ টাকা। বিপরীতে গ্রামে মাথাপিছু আয় ৬ হাজার ৯১ টাকা। অর্থাৎ গ্রামের চেয়ে শহরের একজন মানুষ মাসে ৪ হাজার ৮৬০ টাকা বেশি আয় করেন।
গ্রামে উৎপাদিত পণ্য শহরের চাহিদা মেটানোর পরও গ্রামীণ জীবনে মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়ার পেছনে বাজার অব্যবস্থাপনা দায়ী বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনূস। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গ্রামীণ এলাকায় সাধারণত উৎপাদক ও নিম্ন আয়ের মানুষ বাস করে এবং শহরে সরবরাহ করে। তবে সেখানে মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি হওয়া উদ্বেগজনক। এটি কমাতে হলে প্রথমেই বাজার ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। কোনো পণ্য গ্রাম থেকে শহরে পৌঁছাতে হলে সেখানে যেন তাকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে।’
গ্রাম ও শহরে মূল্যস্ফীতির পার্থক্য কমিয়ে আনতে হলে বাজারভিত্তিক পণ্য সরবরাহ, বিপণন ও দাম নির্ধারণ করা যেতে পারে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তার মতে, ‘খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম গ্রামে বেশি হওয়া স্বাভাবিক, বিপরীতে খাদ্যপণ্যের দাম শহরে বেশি হবে। কিন্তু সেখানে যদি পার্থক্য অনেক বড় হয়ে যায় তাহলে সেটা উদ্বেগজনক। এতে গ্রামের সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানোর খরচ বেড়ে যাবে।’
মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি জাতীয় গড় মজুরি হারও কমেছে আগস্টে। ওই মাসে জাতীয় গড় মজুরি হার হয়েছে ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। এর মানে হলো যত মূল্যস্ফীতি হয়েছে, এর চেয়ে মজুরি কম বেড়েছে। ফলে বাজার থেকে পণ্য কিনতে চাপ বাড়ছে।










