এর সঙ্গে গত জুলাইয়ের বকেয়া যুক্ত হলে তা আরো বাড়বে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিপিডিবির কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পাওনা ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল।

বিপিডিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বেসরকারি মালিকানাধীন কেন্দ্র এবং দেশী-বিদেশী যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে গত জুন পর্যন্ত বিদ্যুৎ কেনা বাবদ বকেয়া পড়েছে ৪৩ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বকেয়া। বাকিগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ভারত থেকে সরকারিভাবে আমদানীকৃত বিদ্যুতের বিল এবং আদানি পাওয়ারের পাওনা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিডিবির দুই কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, বিদ্যুৎ খাতের এ বকেয়া কোনো নতুন ঘটনা নয়; এটি বিগত সরকারগুলোর সময় থেকে চলে আসা ধারাবাহিকতার অংশ। বিভিন্ন সময়ে বকেয়ার পরিমাণ ওঠানামা করেছে—কখনো তা ১০ মাসের বিলের সমপরিমাণ হয়েছে, আবার কখনো পাঁচ মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে।

তারা বলেন, নিয়মিতভাবে বিল পরিশোধ না হলে বকেয়ার পরিমাণ বাড়তে থাকাই স্বাভাবিক। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি আমদানি করা বিদ্যুতের বিল মিলিয়ে বিপিডিবির হিসাবে বর্তমানে মোট বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।

এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিপিডিবির কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বকেয়ার পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়। তবে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় অর্থের ঘাটতি, অর্থ বিভাগের ভর্তুকির অর্থ পেতে বিলম্ব এবং বিল পরিশোধের হার কমে যাওয়ায় বকেয়া আবার বাড়তে শুরু করে।

দেশে এলএনজি আমদানিতে ঘাটতি, টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি এবং স্থানীয় গ্যাসও কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমছে। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বড় আকারে লোডশেডিং হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাস সংকটের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানার উৎপাদনও। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদন সচল রাখতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে শিল্প খাতে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। এর বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

বেসরকারি বিদ্যুৎ উদ্যোক্তারা বলছেন, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে তারা প্রস্তুত। তবে এজন্য আগে বকেয়া বিল পরিশোধের বিষয়টি সমাধান করতে হবে। বর্তমানে বিপিডিবির কাছে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। উদ্যোক্তাদের দাবি, অন্তত পাঁচ মাসের বকেয়া বিল পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রাখতে নিয়মিত বিল পরিশোধের নিশ্চয়তাও প্রয়োজন।

বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিচ্ছে বিপিডিবি। আরো আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেয়া যাবে যদি এ কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করা যায়। সেক্ষেত্রে সরকারকে অন্তত পাঁচ মাসের বকেয়া পরিশোধ করতে হবে এবং জ্বালানি আমদানির জন্য নিয়মিত বিল পরিশোধও ঠিক রাখতে হবে। তাহলে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেয়া সম্ভব।’

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, দেশে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওনা গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর। এরপর ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিল বকেয়া, বাকি অর্থ পায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো। বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে সামিটের পাওনা সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে। কোম্পানিটি বিপিডিবির কাছে ৫ হাজার কোটি টাকা পায়। এর মধ্যে জ্বালানি তেলচালিত (ফার্নেস অয়েল) বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বকেয়া বিল ২ হাজার ২০০ কোটি ও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

বিপিডিবির কাছে বড় একটি বকেয়া বিল পড়ে রয়েছে ইউনাইটেড গ্রুপের। গ্যাস ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাবদ বিপিডিবির কাছে প্রতিষ্ঠানটির মোট পাওনা ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর আড়াই হাজার কোটি এবং গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের বকেয়া বিল ৭০০ কোটি টাকার মতো।

দেশে গ্যাস ও জ্বালানি তেলচালিত বেসরকারি আরো যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে, সেগুলোর বকেয়া সুনির্দিষ্টভাবে তাৎক্ষণিক জানা যায়নি। তবে সবগুলোর মোট বকেয়ার পরিমাণ ১৫ হাজার কোটি টাকার কম নয় বলে জানা গেছে। এছাড়া যৌথ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ভারত থেকে সরকারিভাবে আমদানি করা ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের বিল, আদানির কেন্দ্রের বড় অংকের অর্থ বকেয়া রয়েছে।

দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা অন্তত সাত হাজার মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্র সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগে নির্মাণ করা হয়েছে। সরকারি বিদ্যুৎ ও যৌথ উদ্যোগের বকেয়ার বিষয়টি সামাল দিতে পারলেও বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বিল পরিশোধে জটিলতায় পড়ছে বিপিডিবি।

চট্টগ্রামে নির্মিত বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এসএস পাওয়ার। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বিপিডিবির কাছে বকেয়া পড়েছে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি। প্রতি মাসে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাবদ বিল আসে ১ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। তবে বিপিডিবি পরিশোধ করছে এর ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত। এতে কেন্দ্রটির জ্বালানি আমদানি ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধেও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

এ বিষয়ে এসএস পাওয়ারের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মো. ইবাদত হোসেন ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রেখে বিপিডিবির চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ দেয়া হচ্ছে। তবে প্রতি মাসে যে পরিমাণ বিল আসছে তা পরিশোধ হচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে কেন্দ্রটি পরিচালনায় এবং প্রকল্পে নেয়া ঋণে। এপ্রিল থেকে বকেয়া বিল জমেছে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি। এতে জ্বালানি আমদানির সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় প্রভাব পড়ছে।’

বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়ার বিষয়ে জানতে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।