আমের গুটি (করালি) অবস্থায় এমন দুর্যোগে মাথায় হাত পড়েছে চাষী ও বাগানিদের। জমির গম কাটার ঠিক আগ মুহূর্তে শিলাবৃষ্টিতে জমির পাকা ও আধাপাকা গম মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। কোথাও শিলার আঘাতে পেঁয়াজের কদমের শীষ ভেঙে জমিতে শুয়ে গেছে। শ্রীপুরে উপজেলার ছাতিরবাজারে নিজের দোকানের চালের নিচে চাপা পড়ে সিরাজুল ইসলাম (৬৫) নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। গাছ উপড়ে গেছে অন্তত ৪০০ জায়গায়, বিদ্যুতের তার বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত—
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: চাঁপাইনবাবগঞ্জে হঠাৎ শিলাবৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে আম উৎপাদনকারী এ জেলায় শিলাবৃষ্টির ফলে আমের গুটি ঝরে পড়া ও গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল বিকালে জেলার শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র শিলাবৃষ্টি আঘাত হানে। শিবগঞ্জের প্রায় সব এলাকাতেই ঘণ্টাব্যাপী এ শিলাবৃষ্টি হয়। এ সময় প্রায় ১০০ গ্রাম ওজনের শিলা পড়তে দেখা গেছে।
স্থানীয় আম চাষীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে আমগাছে গুটি আসার সময়। এ সময়ে বড় আকারের শিলাবৃষ্টির ফলে আমের গুটি ঝরে পড়া এবং ডালপালা ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি গাছের ছাল ও পাতারও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যা সামগ্রিক আম উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষি বিভাগের জরিপের দিকে তাকিয়ে আছেন উদ্বিগ্ন চাষীরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জে হঠাৎ শিলাবৃষ্টিতে আম ও ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখনই ক্ষতির পরিমাণ বা শতকরা হার বলা সম্ভব নয়। তবে ক্ষতির পরিমাণও কম না।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) ইয়াসিন আলী জানান, ভোলাহাট উপজেলা বাদে জেলার বাকি চারটি উপজেলাতেই কমবেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং কোথাও কোথাও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের শিলাবৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরো জানান, সকাল থেকে বৃষ্টির পরিমাণ এবং শিলাবৃষ্টিতে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক চিত্র মাঠ পর্যায়ে জরিপ করার পর বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে। আমরা মাঠ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে।
নাটোর: বছরের প্রথম শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছেন উত্তরের জেলা নাটোরের কৃষকরা। গতকাল বিকালে হঠাৎ করে ব্যাপক শিলাবৃষ্টিতে এ ক্ষতির মুখে পড়েন তারা। চলনবিল অঞ্চলের বোরো ধান এবং মৌসুমি ফল আমসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, অনেক কৃষকের জমিতে ভুট্টা মাটিতে নুয়ে গেছে। পাশাপাশি বোরো ধান, আম, কলা, সবজিখেত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আমের মৌসুমের শুরুতেই গাছে আসা ছোট গুটি ঝরে পড়ায় উদ্বিগ্ন বাগান মালিকরাও। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে হঠাৎ করেই কালো মেঘে ছেয়ে যায় নাটোরের আকাশ। এরপর শুরু হয় ঝড়ো হওয়ার সঙ্গে শিলাবৃষ্টি। জেলার নাটোর সদর, বড়াইগ্রাম, বাগাতিপাড়া ও চলনবিলের সিংড়া উপজেলায় ১৫-২০ মিনিটের এ শিলাবৃষ্টি হয়। বৃষ্টির পানির চেয়ে শিলাবৃষ্টি বেশি হওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ। তবে প্রাথমিকভাবে বোরো ধান, আম, কলা, ভুট্টাসহ অন্যান্যে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এরই মধ্যে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ফসলের ক্ষতি নির্ণয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন বলে জানান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলাম খান। ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে প্রণোদনার আওতায় আনার কথাও জানান তিনি।
গাজীপুর: গাজীপুরের শ্রীপুরে কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে উপজেলার ছাতিরবাজারে নিজের দোকানের চালের নিচে চাপা পড়ে সিরাজুল ইসলাম (৬৫) নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। গাছ উপড়ে গেছে অন্তত ৪০০ জায়গায়, বিদ্যুতের তার বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক জায়গায় বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। মারা যাওয়া সিরাজুল ইসলাম টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর থানার কুনরা গ্রামের গাজী রহমানের ছেলে। ১০ বছর ধরে তিনি ছাতিরবাজারে বাঁশের চাটাই ও সিলিং তৈরির ব্যবসা করছিলেন। ছেলে মো. শাহিন তার সঙ্গে কাজ করতেন। ঝড়ের সময় ওই দোকানের ভেতর সিরাজুল ইসলাম অবস্থান করছিলেন। বাতাসের তোড়ে ঘর ধসে পড়লে চালের নিচে চাপা পড়েন তিনি। পরে সকালে তাকে চালের নিচ থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন স্থানীয়রা।
উপজেলার শিমলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সাঈম সিকদার জানান, তার কয়েকটি লিচুগাছে প্রচুর মুকুল এসেছিল। ঝড়ে চায়না থ্রি লিচুগাছ, আমড়া, জলপাইসহ প্রচুর ফল গাছ ভেঙে গেছে। এছাড়া তার নিজের ও আশপাশের অনেকের ফসলের ক্ষতি হয়েছে। চকপাড়া গ্রামের আনোয়ার হাসান জানান, ঝড়ে তার শসাখেত মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। এছাড়া বাড়ির কয়েকটি কাঁঠাল গাছেরও ক্ষতি হয়েছে। মাওনা উত্তরপাড়া এলাকার বাসিন্দা সজীব মৃধা জানান, ঝড়ে তার ঘরের চালা উড়ে গেছে। এছাড়া ঝড়ে বৈদ্যুতিক সংযোগের বিভিন্ন পয়েন্ট ক্ষতি হওয়ায় অনেক এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, রাতের ঝড়ে মাওনা পল্লী বিদ্যুতের আঞ্চলিক কার্যালয়ের আওতাধীন এলাকায় প্রায় ৪০০ জায়গায় গাছ উপড়ে গেছে। ১০০ জায়গায় বিদ্যুৎ সংযোগের তার ছিঁড়ে গেছে। ২০টি খুঁটির ফিটিংস ভেঙে গেছে, ভেঙে গেছে ছয়টি বৈদ্যুতিক খুঁটি।










