সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্নে অনেকেই ভিটেমাটি, জমিজমা কিংবা পরিবারের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে বিদেশযাত্রার পথ বেছে নেন। প্রিয়জনদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় তারা বিশ্বাস করেন দালালদের প্রতারণামূলক কথায়। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথই কখনো পরিণত হয় মৃত্যুযাত্রায়।

তেমনি এক ঘটনায়, দালাল চক্রের কথায় বিশ্বাস করে, চলতি বছর মার্চ মাসে ভূমধ্যসাগর পথে অবৈধ উপায়ে গ্রিস যাবার সময় অনাহার, ও তৃষ্ণায় প্রাণ হারান ১৮ বাংলাদেশী। তাদের একজন ছিলেন মাসুম (ছদ্মনাম)। ঘটনার পর তার পরিবার একটি হত্যা মামলা করে।

সেই ঘটনার দীর্ঘ প্রায় ৩ মাস পর ওই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একজনকে গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতার ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ মিকাইল ইসলাম (৫২)। সিআইডির টিএইচবি (মানবপাচার প্রতিরোধ) ইউনিট সোমবার বিকালে সিলেট বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।

মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ভূমধ্যসাগরে নিহতদের একজন মাসুম (ছদ্মনাম) ও গ্রেফতার মোহাম্মদ মিকাইল ইসলাম একই গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার আশায় মাসুম মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে বিপজ্জনক পথে ইউরোপ যাত্রায় পা বাড়ান।

চক্রটি গ্রিসে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মাসুমের পরিবারের কাছে মোট ১৩ লাখ টাকা দাবি করে। চক্রের সদস্যরা প্রথমে বিমানযোগে লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং গ্রিসে পৌঁছানোর পর আরো ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের শর্ত দেয়। উন্নত জীবনের আশায় পরিবারের সদস্যরা দালাল চক্রের কথায় বিশ্বাস করে মাসুমের পরিবার এ অর্থ পরিশোধে সম্মত হন।

ঢাকায় ১৭ দিন থাকার পর চক্রের সদস্যরা অন্যদের সঙ্গে মাসুমকেও লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর মাসুম পরিবারকে ফোনে এ চক্রের এক সদস্যকে টাকা পাঠাতে বলে। ছেলের কথা মোতাবেক একটি ব্যাংক হিসাবে গত জানুয়ারি মাসে ৪ লাখ টাকা জমা করেন মাসুমের বাবা। এর কয়েকদিন পর গ্রেফতার মিকাইল মিয়ার কাছে আরো ১ লাখ ৫০ হাজার নগদ টাকা প্রদান করেন।

কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথ হারিয়ে টানা ৬ দিন খাবার ও পানি ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকায় যাত্রীরা দিগ্‌ভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও চরম ক্লান্তিতে মৃত্যু হয় বেশ কয়েকজনের। এর মধ্যে মাসুমও ছিলেন। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো মাঝসমুদ্রেই ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্ধার হওয়া জীবিত ব্যক্তিরা।

মামলার তদন্তে জানা যায়, একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশগমনেচ্ছুদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করত। চক্রটি বৈধ অভিবাসনের পরিবর্তে অবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে মানবপাচার কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আটকে রেখে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপে পাঠানোর ব্যবস্থা করত।

মার্চ মাসের ২১ তারিখ ১৮ জন বাংলাদেশীসহ মোট ৪৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অবৈধ সমুদ্রপথে গ্রিসের উদ্দেশে পাঠানো হয়। যাত্রাপথে নৌযানটি ভূমধ্যসাগরে আটকা পড়ে। খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা। অবশেষে অনাহার ও পানিশূন্যতায় প্রাণ হারান একাধিক ব্যক্তি, যাদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশী ছিলেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মাধ্যমে মাসুমের পরিবার জানতে পারে, মৃতদের মধ্যে তাদের ছেলেও ছিলেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মানবপাচার কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে মিকাইল ইসলাম। আইনানুগ প্রক্রিয়ার জন্য তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বর্তমানে এ প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতার, আর্থিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা উদঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।