আইনগতভাবে অপরাধ জেনেও সিরাজগঞ্জে বেশির ভাগ বিয়ে হচ্ছে যৌতুকের মাধ্যমে। বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে অধিকাংশ মানুষ যৌতুক বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে। গ্রামাঞ্চলের মানুষ অধিকাংশই সাধ্যমতো যৌতুক দেয়ার পক্ষে। তাদের যুক্তি মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দিলে তারা স্বামীর বাড়ি সম্মান নিয়ে সংসার করতে পারবে। অন্যদিকে ছেলের বাবারা মনে করেন ছেলেকে বড় করে তুলতে অনেক অর্থ খরচ করতে হয়, তাই যৌতুক তাদের প্রাপ্য অধিকার। আবার অনেকে মনে করেন যৌতুকের টাকায় সংসারের অভাবও অনেকটা ঘুচে যায়। ফলে সামাজিক ব্যাধি যৌতুকের কারণে নারী নির্যাতন বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। পাশাপাশি বাড়ছে জেলায় যৌতুক মামলার সংখ্যাও।

জেলার তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের ঝুরঝুরি লক্ষ্মীপুর গ্রামের ইউনুস আলীর মেয়ে নাজমা বলেন, ২০২০ সালে ১ ডিসেম্বর একই উপজেলার চন্ডিভোগ গ্রামের আজিজুর রহমানের ছেলে বিদ্যুৎ হোসেনের সঙ্গে নগদ ৮০ হাজার টাকা, দেড় ভরি স্বর্ণালংকার এবং আসবাব দিয়ে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে বাবার বাড়ি থেকে আরো টাকা নিয়ে আসার জন্য চাপ দিয়ে বিভিন্নভাবে মানসিক, পরে শারীরিক নির্যাতন করতে থাকেন স্বামী ও তার পরিবারের লোকজন। এ অবস্থায় থানা পুলিশ ও আদালতে মামলা করে ফয়সালা করতে হয়েছে। নাজমা এখন বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন।

ভুক্তভোগী নাজমার বাবা ইউনুস আলী বলেন, মেয়ের বিয়ের সময় যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিয়েছি। মেয়ে স্বামীর সংসারে সম্মান নিয়ে থাকবে এই ভেবে। তাছাড়া গ্রামে যৌতুক ছাড়া মেয়ে বিয়ে দেয়াও যায় না।

জেলা রেজিস্টার অফিস সূত্র থেকে জানা যায়, জেলায় বছরে প্রায় ১৬ হাজার বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়। এর বেশির ভাগই যৌতুকের বিয়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে জেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে যৌতুকের মামলা। মামলা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন আইনজীবীরা।

সিরাজগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন আদালত-১-এর এপিপি কায়সার আহাম্মেদ লিটন বলেন, যৌতুকের মামলা যে অনেক বেশি তা বলা যায়। যৌতুকের মামলার প্রবণতার হার গ্রামের অশিক্ষিত, গরিব ও অসচ্ছল পরিবারের মধ্যে বেশি। অনেক সময় মামলার তদন্তকালেই আদালতের মাধ্যমে অনেক যৌতুক মামলা ফয়সালা করার চেষ্টা করা হয়। এইভাবে মোট মামলার প্রায় ২৫ ভাগ মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব হয়। এতে যৌতুক মামলার দীর্ঘসূত্রতায় ভোগান্তি, সময় ও অর্থ অপচয় অনেকটা কমে আসে। তিনি আরো বলেন, আদালতে এখন প্রায় ছয় হাজার যৌতুকের মামলা বিচারাধীন।

সিরাজগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন আদালতের এপিপি আনোয়ার পারভেজ লিমন বলেন, প্রতি মাসে দুই শতাধিক যৌতুকের মামলা হচ্ছে। মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, শিক্ষিত, অশিক্ষিত গ্রাম আর শহর নেই, কম-বেশি যৌতুক ছাড়া বিয়ে হয় না।

জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন, এ বিষয়ে আমাদের প্রচার-প্রচারণা রয়েছে। তবে গ্রামের মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে গুরুত্ব খুবই কম। তিনি আরো বলেন, আইনের প্রয়োগের চেয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করলে যৌতুকপ্রথা বন্ধ হতে পারে। এক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।