অক্টোবরের শেষ নাগাদ চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতুতে যানবাহন চলাচলের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে কর্মকর্তারা।

কালুরঘাট সেতুর সংস্কারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০২৩ সালের ১৬ জুন। চুক্তি অনুযায়ী ৩ মাসের মধ্যে সেতুটি ট্রেন চলাচলের উপযোগী এবং ৮ মাসের মধ্যে মানুষ পারাপার ও সব ধরনের যানবাহন চলাচলের উপযোগী করার কথা। কিন্তু ১৫ মাসেও সেতুটি যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে পারেনি রেলওয়ে। সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচলে আরো অন্তত এক মাসের সময় নিয়েছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও রেলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী মাসের শেষের দিকে এই সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচলের সম্ভাবনা রয়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ডিসেম্বর থেকে এই সেতু দিয়ে কক্সবাজারগামী ট্রেন চলাচল শুরু হলেও ভারী সংস্কার কাজের জন্য যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সময়সীমা বেধে দেয়া সত্ত্বেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সর্বশেষ কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতায় কাজের বিলম্ব হয়। যার কারণে ট্রেন সার্ভিস চালুর পরও যানবাহন চলাচলের জন্য উপযুক্ত হয়নি সেতুটি। সর্বশেষ ২০ সেপ্টেম্বর রেলপথ সচিব আবদুল বাকী চট্টগ্রাম ভ্রমণের সময় রেলওয়ে কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠকে আরো এক মাসের সময় পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে সেতুটিকে আরো বেশি শক্তিশালী করতে ১৯টি পিয়ারের নদীর তলদেশে জিও ব্যাগ স্থাপনের কাজ আরো কয়েক মাস বিলম্বিত হবে বলে জানিয়েছে রেলের সেতু বিভাগ।

এদিকে সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সেতুটির মেরামত কাজ পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তিন সদস্যের পরামর্শক টিম। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল আমিনের নেতৃত্বে দলটি সেতু সংস্কার কাজের সার্বিক অগ্রগতি শেষে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে কাজের বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেবেন। মূলত বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল যে নির্দেশনা দেবে সেই অনুযায়ী সেতুতে যানবাহন চলাচল ছাড়াও ভুলত্রুটি নির্ধারণ করে বাদবাকি কাজ সম্পন্ন করা হবে। সেতু দিয়ে স্বল্পগতিতে ভারী ট্রেন চলাচল করলেও সেতু চলাচলের গতিবেগ কত হবে সেটাও বিশেষজ্ঞ দল নির্ধারণ করে দেবে বলে জানিয়েছে রেলের প্রকৌশল বিভাগ।

ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক মো. মেহেদী হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্রেন চলাচলের জন্য কালুরঘাট সেতু উন্মুক্ত করে দিয়েছি। এরপরও নানান প্রতিকূলতার কারণে যানবাহন চলাচলের জন্য সেতু সংস্কার কাজ শেষ করা যায়নি। এখন সেতুর ৯৮ শতাংশ কাজই শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে ডেকোরেশনের কাজ। আগামী এক মাসের মধ্যে সেতুটিকে সব ধরণের যানবাহন চলাচলের উপযুক্ত করে খুলে দেয়া হবে। সেতুতে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় বিকল্প পন্থায় ফেরি দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে বোয়ালখালী উপজেলার মানুষদের।  

কালুরঘাট সেতু সংস্কারের বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবু জাফর মিঞা বণিক বার্তাকে বলেন, কালুরঘাট সেতুর সিংহভাগ কাজই শেষ হয়েছে। এরপরও কিছু আনুষাঙ্গিক কাজ ও কাজের মান যাচাইয়ের জন্য যানবাহন চলাচলে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। বুয়েটের পরামর্শক টিম এসে পরিদর্শন করে কাজের মান যাচাই করেছেন। পরামর্শক টিম আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দেবে। তবে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের দিকে সেতুটি বাণিজ্যিকভাবে সড়কযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩১ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের অধীনে নির্মিত হয়েছিল ৬৩৮ মিটার দৈর্ঘ্যের স্ট্রিল স্ট্রাকচারের সেতু। শুরুতে শুধুমাত্র ট্রেন চলাচল করলেও ১৯৬২ সাল থেকে এই সেতু দিয়ে সড়কযান চলাচল শুরু হয়। রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ সড়কের টোল আদায় করে। যদিও ফেরি সার্ভিস চালু হলে যানবাহনের টোল আদায়ের দায়িত্ব বর্তাবে সওজের ওপর। জরাজীর্ণ সেতুটি দিয়ে আগে মাত্র ১০ কিলোমিটার গতিবেগে ট্রেন চলাচল করত। হালকা ওজনের লোকোমোটিভ ও কয়েকটি রেকের ট্রেন দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত দৈনিক এক জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও সংস্কারের পর এই সেতু দিয়ে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার গতিবেগে ট্রেন চলবে বলে আশা করছে রেলওয়ে।

সেতুটি দিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন তিন জোড়া ও সপ্তাহে কয়েকদিন দোহাজারীগামী তেলের ওয়াগন চলাচল করলেও এই সেতু দিয়ে দৈনিক ২২-২৩ জোড়া ট্রেন চলাচলের পরিকল্পনা রয়েছে। আগে দরপত্রের মাধ্যমে রেলের নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুর যানবাহনের টোল আদায় করলেও আগামী মাসে যানবাহন চলাচল শুরু হলে শুরুতে নিজস্ব জনবল দিয়ে টোল আদায় করবে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

দেশের একমাত্র রেল কাম সড়ক সেতুর সংস্কার কাজ প্রসঙ্গে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, কালুরঘাট সেতু ট্রেনের জন্য হলেও বিকল্প সেতু না থাকায় উভয় পাড়ের মানুষের সুবিধার্থে সড়কযানও চলাচল করে। সংস্কার কার্যক্রমে সড়ক যানবাহনকে প্রাধান্য দেয়া হলেও আগামীতে কক্সবাজারগামী কয়েক গুণ বেশি ট্রেন সার্ভিসের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। আগামী মাসের মধ্যে সেতুটি দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে যানবাহন চলাচল সম্ভব হবে। টোল আদায়ের জন্য এরই মধ্যে ভূ-সম্পত্তি বিভাগ কাজও শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।