সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প পদ্মা সেতু। এ মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২১ সালের জুনে। একই সময়ে পদ্মা সেতু রেল সংযোগের একাংশও চালুর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। আর ২০২২ সালে উৎপাদনে যাওয়ার কথা আরেক মেগা প্রকল্প রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাস এসে পাল্টে দিয়েছে এসব প্রকল্পের ভবিষ্যৎ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বল্প পরিসরে নির্মাণকাজ এগিয়ে চললেও পিছিয়ে যেতে পারে বাস্তবায়ন।

শুধু এ তিন মেগা প্রকল্পই নয়, মেট্রোরেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও টাঙ্গাইল-রংপুর চার লেন মহাসড়ক নির্মাণসহ দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে চলা সিংহভাগ প্রকল্প নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাস্তবায়ন বিলম্বিত হলে প্রকল্পগুলোর নির্মাণ ব্যয়ও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

৩৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ হচ্ছে বহুকাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২১ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা জানিয়েছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আগামী জুলাইয়ের মধ্যে সেতুর সবক’টি স্প্যান বসানোর কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই স্প্যান বসানোর কাজ শেষ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন প্রকল্প এলাকায় কর্মরত চীনা প্রকৌশলীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই প্রকৌশলী বণিক বার্তাকে বলেন, দুটি স্প্যান এখনো চীনে আটকে আছে। সব মিলিয়ে ১৩টি স্প্যানের কাজ বাকি। কোনোভাবেই তা জুলাইয়ের আগে শেষ করা যাবে না। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নদীতে প্রবল স্রোত থাকে। ফলে সে সময় স্প্যান বসানোর কাজটা আরো কঠিন বলে জানান তিনি।

পদ্মা সেতু নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর নভেল করোনাভাইরাস উপদ্রুত চীনের হুবেই প্রদেশে। চীনা কর্মী ও প্রকৌশলীদেরও একটা বড় অংশ চীনে অবস্থান করছেন। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে প্রকল্পের ৭০ শতাংশ বাংলাদেশী কর্মীকেও ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজে দেখা দিয়েছে শ্রমিক সংকট। এ কারণে সেতুর কাজ আরো বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

করোনার প্রভাবে পদ্মা সেতুর কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি সরকারের সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা যেমন স্বীকার করেছেন, তেমনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চীনা প্রকৌশলীরাও।

নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে পদ্মা সেতুর কাজ কিছুটা বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন পদ্মা সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চীনা রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের প্রকল্প পরিচালক লিউ জিয়ানহুয়া। গত ৪ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পের অনেক চীনা কর্মী নববর্ষের ছুটিতে গিয়ে আর বাংলাদেশে ফিরতে পারেননি। এজন্য বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় কিছুটা হলেও কর্মী সংকট রয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম আনতেও বিলম্ব হচ্ছে। এসব সমস্য তৈরি হয়েছে চীনে ব্যাপক হারে কভিড-১৯ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কারণে। শুধু পদ্মা সেতুর কাজে এর প্রভাব পড়ছে।

সেতু বিভাগের অধীনে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে পদ্মা সেতুর কাজ পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন এসব সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা। জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেতুর নির্মাণকাজে আমরা সব কর্মীকে পাচ্ছি না। তবে এ কর্মী সংকটের যেন বিরূপ প্রভাব নির্মাণকাজে না পড়ে, সেজন্য এরই মধ্যে দুটি রোবট দিয়ে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করা হচ্ছে। তবে এ রোবট চালাতেও দক্ষ কর্মী দরকার, যেটা আমাদের তেমন নেই। তার পরও আমরা চেষ্টা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে। কিন্তু ভাইরাসটির প্রভাবে সেতুর কাজ দু-এক মাস পিছিয়েও যেতে পারে বলে জানান তিনি।

পদ্মা সেতু চালুর দিন থেকেই সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন পরিচালনার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে রেল সংযোগ নির্মাণ প্রকল্পের কাজও। ৩৯ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। চারটি অংশে ভাগ করে এগিয়ে চলছে নির্মাণকাজ। প্রথম অংশ ঢাকার-কমলাপুর থেকে গেন্ডারিয়া স্টেশন। দ্বিতীয় অংশ গেন্ডারিয়া থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৬ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার রেলপথ ও চারটি স্টেশন নির্মাণ। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজটি এগিয়ে নিচ্ছেন নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা চীনা প্রকৌশলী-শ্রমিকরা।

তাদের সহায়তা করছেন বাংলাদেশী প্রকৌশলী-শ্রমিকরাও। প্রকল্পের কাজ সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে মাওয়া-ভাঙ্গা (ফরিদপুর) অংশে। ৪২ কিলোমিটার রেলপথ ও পাঁচটি স্টেশনের নির্মাণকাজ অর্ধেকে এসে ঠেকেছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। এগিয়ে চলছে চতুর্থ অংশের ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত রেলপথ ও স্টেশনের নির্মাণকাজও।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে প্রকল্পটির বাস্তবায়নও পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। পদ্মা সেতুর মতো পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ঠিকাদারও চীনা রেলওয়ে গ্রুপ। গত ৪ মার্চে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রকল্পটির চীনা রেলওয়ে গ্রুপের প্রকল্প পরিচালক ওয়াং কুন। বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিংয়ের উপস্থিতিতে ওই সংবাদ সম্মেলনে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে নির্মাণকাজ কিছুটা পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কা করেছিলেন ওয়াং কুন।

সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা আরেক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে করোনা সংকটের মধ্যেও। প্রকল্পের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের অভ্যন্তরীণ কন্টেইনমেন্ট নির্মাণের তৃতীয় ধাপে সপ্তম প্রি-স্ট্রেসড মাউন্টিং ব্লক স্থাপন করা হয়েছে। প্রথম ইউনিটের অভ্যন্তরীণ কন্টেইনমেন্ট নির্মাণের তৃতীয় ধাপে ১২টির প্রি-স্ট্রেসড মাউন্টিং ব্লক স্থাপনের কাজ চলমান আছে।

মাটির নিচে ৩০ মিটার কাঠামোর নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর স্থাপিত হয়েছে কোর ক্যাচার। বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ কোর ক্যাচার। একই সঙ্গে এগিয়ে চলছে বহিঃস্থ কন্টেইনমেন্টের নির্মাণকাজ। এটির উচ্চতা হবে ৬৪ দশমিক ৫ মিটার। রাশিয়া থেকে আসার পর চলতি বছরেই প্রথম ইউনিটে রিয়্যাক্টর ইনস্টলেশন কাজ শুরু হবে বলেও জানিয়েছেন রূপপুর প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করে কাজ করার কথাও জানিয়েছেন প্রকল্পের কর্মকর্তারা।

২০২২-এর ডিসেম্বরে উৎপাদনে যাওয়ার কথা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের। পুরো নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে এখনো নির্মাণে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের কর্মকর্তারা। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে কাজ চালিয়ে যেতে চাইছেন না কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকরা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষও রয়েছে। ফলে বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কার মধ্যে রয়েছে এ প্রকল্পও।

যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার গৃহীত অন্য মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নও পিছিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব প্রকল্পের মধ্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল, সেতু বিভাগের বাস্তবায়নাধীন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও বাংলাদেশ রেলওয়ের বাস্তবায়নাধীন দোহাজারী-কক্সবাজার-রামু রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ এক প্রকার থমকে আছে। বাকি প্রকল্পগুলোও একই পথে চলছে।