অবৈধভাবে নদী দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, শিল্প-কারখানার দূষণ, পলি ভরাটসহ বিভিন্ন কারণে সিলেট বিভাগের ৩১টি নদী আজ সংকটাপন্ন। এর মধ্যে সিলেটের প্রধানতম দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারাও রয়েছে। গতকাল ‘সিলেট বিভাগীয় নদীবিষয়ক কর্মশালা’য় এ তথ্য উঠে আসে। শহরতলির খাদিমনগরের একটি রিসোর্টে যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) ও পানি অধিকার ফোরাম।
কর্মশালায় জানানো হয়, নদী রক্ষা কমিশনের সর্বশেষ ২০২৩ সালের হিসাবমতে, দেশে ১ হাজার ৮টি নদ-নদী রয়েছে। সিলেট বিভাগে রয়েছে ১৬৮টি। এর মধ্যে সিলেটে ৩৫টি, সুনামগঞ্জে ৯৭টি, মৌলভীবাজারে আটটি ও হবিগঞ্জে ২৮টি। যদিও আলোচকদের দাবি, সরকারি এ তথ্যে গরমিল রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের অনেক নদ-নদী এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে। সিলেটেও এমন বেশ কয়েকটি নদী তালিকায় রয়েছে কিন্তু অস্তিত্ব নেই। এছাড়া বেশকিছু নদীর তীর ১ হাজার ১৯৪ জন দখল করে রেখেছে।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এ বিভাগের চার জেলার মধ্যে সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, ডাউকি, পিয়াইন, ধলাই, লোভা, সারি, বাসিয়া ও চেঙ্গেরখাল নদী বেশি সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। সুনামগঞ্জের ধোপজান, যাদুকাটা, নলজুর, বৌলাই, রক্তি, চেলা, খাশিয়ামারা, কুশিউড়া, মাহরাম, মহাসিং ও বোকা নদী অস্তিত্ব হারানোর পথে। মৌলভীবাজারের ধলাই, মনু, জুড়ী, কণ্ঠীনালা ও গোপলা নদী এবং হবিগঞ্জ জেলার খোয়াই, সুতাং, সোনাই, বরাক, কাষ্টি ও করাঙ্গী নদীরও আজ বিপন্ন অবস্থা। মূলত নদী দখল করে স্থাপনা নির্মাণ; অবৈধভাবে বালি-পাথর উত্তোলন ও দূষণ; অপরিকল্পিত বাঁধ, সেতু ও স্লু্ইস গেট নির্মাণ; খালের সঙ্গে নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা; নদীগর্ভে পলির অবক্ষেপণ ও পলির অব্যবস্থাপনার কারণে নদীগুলোর অবস্থা এমন সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।
কর্মশালার সঞ্চালক বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘নদী কেবল জীবন্ত সত্তা নয়, এর সঙ্গে মানুষের আত্মার সম্পর্ক রয়েছে। নদীর পানির স্রোত আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। নদীকে আমরা মেরে ফেলতে পারি কিন্তু সৃষ্টি করতে পারি না। আর নদীকে বাঁচাতে না পারলে নিজেরাও বাঁচতে পারব না। আগামী প্রজন্মকে বাঁচানোর জন্য নদীকে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।’
এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন। এতে আলোচনায় অংশ নেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক, বন বিভাগ সিলেটের সহকারী বন সংরক্ষক মো. নাজমুল আলম, মৎস্য অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম।
বক্তারা বলেন, সিলেট বিভাগের নদ-নদীগুলো নির্বিচারে দখল, দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালি ও পাথর উত্তোলনের ফলে সংবেদনশীল প্রতিবেশ ব্যবস্থায় মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে; যা জীবন-জীবিকা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এসব নদ-নদী থেকে পরিকল্পিতভাবে বালি ও পাথর উত্তোলন করতে হবে। সেগুলো কোনোভাবেই ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত নয়। নদ-নদীর সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে দেশ ভবিষ্যতে মরুভূমিতে পরিণত হবে। এ ব্যাপারে সরকারের সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তারা।
কর্মশালার শুরুতে ‘সিলেট বিভাগের নদ-নদী পরিস্থিতি: সংকট ও করণীয়’ বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আখতার ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেচ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. পীযূষ কান্তি সরকার। নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে তারা বেশকিছু সুপারিশ করেন। এর মধ্যে রয়েছে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী সব অবৈধ বাঁধ অপসারণ, অবৈধ বালি-পাথর উত্তোলন বন্ধ, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এবং পরিবেশ বিধিমালা ১৯৯৭ বিবেচনায় নিয়ে নদীর দূষণ ও দখলমুক্ত করা, ১৯৯৫ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নদী-খাল ইজারা বন্ধ করা, পর্যায়ক্রমে নদীর সব ধরনের বাধা অপসারণ, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী নদ ও নদীর সঠিক সীমানা নির্ধারণ করে তা সুরক্ষিত রাখা ইত্যাদি।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সংকটাপন্ন সারি নদী পরিদর্শন করেন।










