হামলা ও ভাংচুরের পরদিন থেকেই স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার চেষ্টা করছে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। টিকাদান কার্যক্রম চালু হলেও অন্যান্য সেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। কেন্দ্রটির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানের কমিউনিটি হেলথ প্রোগ্রামের পরিচালক ইকবাল জিল্লুল মজিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারিন জাহান সিগমা
স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?
রাড্ডা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক, কাউন্সেলর, পুষ্টিবিদ, ফিল্ড সুপারভাইজার, মাঠকর্মী, রেজিস্ট্রেশন কর্মী, নিরাপত্তা কর্মীসহ প্রায় ২৬-২৭ জন কাজ করতেন। এখানে শিশু, কিশোরী, গর্ভবতী ও প্রসবোত্তর মা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিতে আসা নারী ও সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হতো। গর্ভবতী মায়েদের জন্য সিবিসি, হিমোগ্লোবিন, ইউরিন পরীক্ষাসহ প্রাথমিক প্যাথলজি সেবাও ছিল। প্রতিদিন গড়ে ৩০০-৩৫০ রোগী ও সেবাগ্রহীতা কেন্দ্রে আসত। চিকিৎসা, প্যাথলজি, কাউন্সেলিং ও পুষ্টিসেবার জন্য ছিল পৃথক কক্ষ। পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমও চলত। ফলে কেন্দ্রটি মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছিল।
এখন প্রতিদিন কতজন সেবা নিচ্ছে?
হামলার পর প্রথম দিন ২১ জন এসেছিল। পরে ধীরে ধীরে এ সংখ্যা বেড়ে সর্বশেষ একদিনে ৭৫-এ পৌঁছেছে। মানুষ জানতে পারছে যে কেন্দ্রে আবার সেবা চালু হয়েছে, তাই রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। তবে অনেক গর্ভবতী মা আগে থেকে নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী কেন্দ্রে আসেন। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা অবগত না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে এসে সেবা না পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের ওপর সবচেয়ে বড় কী প্রভাব পড়ছে?
শিশুদের টিকাদান নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। কোন এলাকায় কত শিশুকে বিসিজিসহ বিভিন্ন টিকা দেয়া হবে, তার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থাকে। একইভাবে গর্ভবতী মায়েরা গর্ভাবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে চিকিৎসকের পরামর্শ, আয়রন ও ক্যালসিয়াম গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে আসেন। কেন্দ্রের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় এসব সেবা গ্রহণে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়াই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।
বর্তমানে টিকাদান কার্যক্রম কতটা স্বাভাবিক হয়েছে?
গত শনিবার টিকাদান কার্যক্রম চালু হয়েছে। শুরুতে কেন্দ্রের ভেতরে উপযুক্ত কক্ষ না থাকায় তাঁবু টানিয়ে টিকা দিতে হয়েছে। পরে দুটি কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে হামের ক্যাচআপ ক্যাম্পেইনের টিকাদানও শুরু হয়েছে। তবে টিকাদান কার্যক্রম চালুর পাশাপাশি অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও দ্রুত প্রস্তুত করা দরকার।
কোন কোন সুবিধা এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি?
চিকিৎসক ও নার্সদের রোগী দেখার জন্য প্রয়োজনীয় ফার্নিচার এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। পরিবার পরিকল্পনা ও গর্ভবতী মায়েদের সেবায় গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে আলাদা কক্ষ ও পর্দার ব্যবস্থা প্রয়োজন। পুষ্টি ও কাউন্সেলিং সেবার জন্যও পৃথক জায়গা দরকার। এছাড়া ব্লাড প্রেসার মাপার যন্ত্র, স্টেথোস্কোপ ও ওজন মাপার যন্ত্রসহ বেশকিছু মৌলিক সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে। এসব কারণে সব সেবা একসঙ্গে আগের মতো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম ও অবকাঠামো পুনর্গঠনে আনুমানিক কত টাকা প্রয়োজন হতে পারে?
প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম ও সেবা পুনরায় চালু করতে প্রায় ১ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। শুধু একটি ভালো মানের আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন কিনতেই প্রায় ২০-২৫ লাখ টাকা লাগবে। এছাড়া সিবিসি, হিমোগ্লোবিন, ইউরিন পরীক্ষাসহ বিভিন্ন প্যাথলজি সেবার জন্য প্রয়োজনীয় রিএজেন্টও নতুন করে সংগ্রহ করতে হবে। এসব উপকরণ আগে কেন্দ্রে ছিল, তবে ভাংচুরে সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।
টিকাদানের রেকর্ড ও তথ্য-উপাত্তের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয়েছে কি?
এটি একটি বড় সমস্যা। শিশুদের টিকার তথ্য রেজিস্টার ও সরকারি ই-ট্র্যাকারে সংরক্ষিত ছিল। এসব তথ্য পাওয়া না গেলে শিশুর আগের টিকা গ্রহণের ইতিহাস নতুন করে সংগ্রহ করতে হবে। যেমন কোনো শিশু পেন্টাভ্যালেন্টের প্রথম ডোজ নিয়ে থাকলে পরবর্তী ডোজ দেয়ার আগে আগের তথ্য যাচাই করা জরুরি। মায়ের কাছে টিকার কার্ড থাকলে কাজটি সহজ হবে, না থাকলে নতুন করে তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করতে হবে। একই সমস্যা কিশোরীদের টিকার ক্ষেত্রেও হতে পারে। ফলে আগের ডোজের তথ্য যাচাই ও পুনরুদ্ধারে অতিরিক্ত সময় ও শ্রম লাগবে।
বর্তমানে কতজন কর্মী দিয়ে সেবা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে?
কেন্দ্রটিতে চিকিৎসক, প্যারামেডিক, নার্স, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, কাউন্সেলর, পুষ্টিবিদ, মাঠকর্মী, রেজিস্ট্রেশন কর্মী, সুপারভাইজার, সোনোলজিস্ট ও নিরাপত্তা কর্মীসহ প্রায় ২৬-২৭ জন কাজ করতেন। বর্তমানে জায়গা সংকটের কারণে সবাই একসঙ্গে কেন্দ্রে বসে কাজ করতে পারছেন না। মাঠকর্মীদের একটি অংশ বাইরে গিয়ে মা ও অন্যান্য রোগীর কাউন্সেলিং করছেন।
ওয়াশরুমসহ অন্যান্য মৌলিক সুবিধার কী অবস্থা?
ওয়াশরুমের ব্যবস্থাও এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। কেন্দ্রটির অধিকাংশ কর্মী নারী ও গর্ভবতী মায়েদের ইউরিন পরীক্ষা করাতে হয় বলে ব্যবহারযোগ্য ওয়াশরুম অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে সেটিও প্রস্তুত করার কাজ চলছে।
অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক কত?
ভবন ও আশপাশের অবকাঠামো মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ দেড় কোটি টাকার কম হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভবনের দেয়ালসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি আশপাশের বড় গাছও কেটে ফেলা হয়েছে।
দীর্ঘদিন সেবা ব্যাহত হলে কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে?
প্রতিদিন গড়ে ৩০০ জন সেবা নিলে মাসে ছয় হাজারের বেশি মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। এর মধ্যে শিশু, কিশোরী ও মায়ের সংখ্যাই বেশি। তবে বর্তমানে কিছু রোগী কেন্দ্রে আসছে এবং ধীরে ধীরে এ সংখ্যা বাড়ছে।
রাড্ডা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিশেষত্ব কী ছিল?
এখানে নারী চিকিৎসক, প্যারামেডিক, নার্স, কাউন্সেলর, পুষ্টিবিদ, রেজিস্ট্রেশন কর্মী ও মাঠকর্মী ছিলেন। ফলে কিশোরীরা তাদের ব্যক্তিগত ও প্রজনন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যে নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের জানাতে পারত। বিশেষ করে মাসিকসংক্রান্ত সমস্যা ও কিশোরীদের অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবায় এ ধরনের নারীনির্ভর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।










