গত ২৪ ঘণ্টায় (রোববার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা গত ৫০ দিনের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় এ সংখ্যা ছিল ১২। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো সর্বশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত ১৭ জনের মধ্যে দুজন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিলেন, বাকি ১৫ জন মারা গেছেন হামের উপসর্গ নিয়ে। মৃতদের মধ্যে ১২ জন ঢাকা বিভাগের এবং পাঁচজন চট্টগ্রাম বিভাগের। গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ মে পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১১-এ। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৫৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামে আক্রান্ত ৫২ শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৩০২ জন শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে, ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে ১৫৪ জনের। এ নিয়ে গত দেড় মাসে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৭৯৩-এ। এছাড়া ৫ হাজার ৪৬৭ জনের দেহে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। বর্তমানে ২৮ হাজার ৮৪২ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে, যার মধ্যে ২৫ হাজার ১৫১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৪৫৬ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগ ও জেলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১১ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে, যার মধ্যে আটজনই
ঢাকা জেলার। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর পরিসংখ্যানেও ঢাকা বিভাগ ১২৭ জন নিয়ে শীর্ষে। এর পরই রয়েছে রাজশাহী (৭০ জন) ও চট্টগ্রাম (২৫ জন) বিভাগ।
হাম নিয়ন্ত্রণে সরকার সারা দেশে ৫ এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করছে। ১৮ কোটি ১২ লাখ ৮০৩ জন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ পর্যন্ত ১৫ কোটি ৫৬ লাখ ২২২ জনকে টিকা দেয়া হয়েছে, যা জাতীয়ভাবে লক্ষ্যমাত্রার ১০১ শতাংশ। বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে কাভারেজ ১০১ শতাংশ হলেও সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে গাজীপুর সিটি করপোরেশন ১৬৬ শতাংশ কাভারেজ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। তবে সিলেট সিটি করপোরেশনে এ হার তুলনামূলক কম, মাত্র ৮২ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। প্রতিদিন আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের উচ্চ হার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ ও জনসচেতনতার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।
দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেনিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হামের প্রকোপ থামানোর জন্য টিকা ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই। ২০ তারিখে টিকা প্রদান শুরু হলেও শিশুর শরীরে পূর্ণ সুরক্ষা শক্তি তৈরি হতে কমপক্ষে চার সপ্তাহ সময় লাগে এবং অনেক ক্ষেত্রে দুটি টিকার প্রয়োজন হয়; তাই আগামী তিন-চার সপ্তাহ হামের এ সংক্রমণের গতি বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।’
আক্রান্ত রোগীর চাপে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে এ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘রোগী যে হারে বাড়ছে তাতে সাধারণ হাসপাতালে জায়গা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। মৃত্যুহার কমাতে আমাদের এখনই দ্রুত ফিল্ড হাসপাতাল বা ক্যাম্প হাসপাতাল তৈরি করে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি হাম প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারি প্রচারণার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক নেতাদের যুক্ত করতে হবে। শিশুদের দ্রুত টিকা দেয়া, ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো এবং পুষ্টিকর ও তাজা ফলমূল খাওয়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ক্রমবর্ধমান হাম এবং নতুন করে ডেঙ্গুর এ প্রকোপ মিলিয়ে দেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।’










