দিনাজপুরের
হিলি স্থলবন্দরের প্রধান সড়কটি দীর্ঘদিন বেহাল অবস্থায় রয়েছে। সড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ ধীরগতিতে হওয়ায় যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আড়াই কিলোমিটার সড়কটি পুরোপুরি খানাখন্দময়। বর্তমানে কাদা পানিতে একাকার সড়কে হেঁটে চলাও দায়। ঘটছে দুর্ঘটনা। ভারী যানবাহন প্রায়ই সড়কে উল্টে থাকে। ঝুঁকি নিয়ে এ সড়কে চলতে
হচ্ছে যানবাহন চালক ও যাত্রীকে।
সড়কটি যানবাহন চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন ভারতীয় ট্রাক চালকরা। এমনকি সড়কটি সংস্কার না করা হলে ভারত থেকে পণ্যবোঝাই ট্রাক নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবেন না বলে জানিয়েছেন তারা। বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বন্ধসহ বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণার কথা জানিয়েছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভারতের হিলি এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড কাস্টমস ক্লিয়ারিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাজেশ আগরওয়াল স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে বাংলাহিলি কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনকে আলটিমেটাম দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হিলি স্থলবন্দরের জিরো পয়েন্টের রেলগেট থেকে শুরু করে পানামা হিলি পোর্ট লিংক লিমিটেডের ৩নং গেট পর্যন্ত এবং হিলি স্থলবন্দরের চারমাথা মোড় হয়ে মহিলা কলেজ পর্যন্ত স্থলবন্দরের প্রধান সড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ শুরু হয় গত বছরের অক্টোবরে। ২ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৩৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (এনডিই) নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ কাজ পায়। দু-এক সপ্তাহ কাজ করার পরই সরঞ্জামাদি নিয়ে চলে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। তারপর থেকে মুখ থুবড়ে পড়ে সড়কের উন্নয়নকাজ। এতে করে চরম ভোগান্তির শিকার হয় যানবাহন চালক ও স্থানীয়রা। এর পর চলতি বছরের মার্চের শেষের দিকে আবারো সড়কটির কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গত জুনে সড়কটির কাজ শেষ করার কথা ছিল।
এদিকে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ‘হিলি স্থলবন্দরের চেকপোস্ট গেটের রেললাইন থেকে শুরু করে পানামা হিলি পোর্ট লিংক গেট পর্যন্ত জাতীয় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে রফতানীকৃত পণ্যবোঝাই ভারতীয় ট্রাকের চালক ও সহকারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। বর্তমানে সড়কের অবস্থা এতই শোচনীয় প্রতিদিনই পণ্যবাহী ট্রাক উল্টে অথবা বিকল হয়ে পড়ছে। এতে করে ট্রাকের যেমন চাকা ফেটে যাওয়াসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি চালক ও সহকারীরা গুরুতর আহত হচ্ছেন। ফলে দুই দেশের মাঝে পণ্য আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে। কারণ চাহিদানুযায়ী যথেষ্ট পণ্যবাহী ট্রাক ঢুকতে পারছে না। অন্যদিকে ট্রাকের চালক ও সহকারীদের জীবনের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। এ অবস্থায় ভারতীয় ট্রাকের চালক ও সহকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে আমাদের জানিয়েছেন যে এমন বেহাল সড়ক দ্রুত সংস্কার না করলে তারা রফতানীকৃত পণ্যবোঝাই ট্রাক নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবেন না। আমরা তাদের আশ্বাস দিয়েছি, বিষয়টি আমরা বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করব।’
ভারত থেকে পণ্য নিয়ে আসা ট্রাকচালক অনিল কুমার বলেন, ‘ভারত থেকে পণ্যবোঝাই ট্রাক নিয়ে বাংলাদেশে এসেছি। কিন্তু স্থলবন্দরের সড়কগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। সড়কের মাঝখানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও হাঁটুসমান গর্ত। বৃষ্টি হলে তো এর অবস্থা আরো বেশি খারাপ হয়। এমন সড়ক দিয়ে ওভারলোড ট্রাক চলাচল একেবারেই অসম্ভব। এতে করে মাঝেমধ্যেই ট্রাকের চাকা ফেটে হয়ে যাচ্ছে। কোনো দিন এক্সেল ভেঙে যাচ্ছে আবার কোনো দিন গিয়ার ফেঁসে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ট্রাক উল্টে যাওয়ার মতো ঘটনা নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কারণে ভয়ে আমাদের কোনো চালক ট্রাক নিয়ে আসতে চান না।’
বাংলাদেশী ট্রাকচালক দুখু মিয়া বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন হিলি স্থলবন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহন করে আসছি। বছরের পর বছর এ সড়কের বেহাল অবস্থা দেখে আসছি। সড়কের কোনো উন্নয়ন নেই। পিচ ঢালা সড়কের ওপর ইট বিছিয়ে দীর্ঘদিন এ সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে হচ্ছে। এর ওপর দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করায় ছোট-বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক শুকনো থাকলে দেখেশুনে চলাচল করা যায় কিন্তু বৃষ্টি হলে চলাচল মুশকিল।’
হিলি নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লিয়াকত আলী বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন তাদের বলে আসছিলাম, বর্ষার আগেই দ্রুত কাজটি শেষ করার জন্য। কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথায় কর্ণপাত করেননি। ফলে প্রতিনিয়তই সড়কে পণ্যবাহী ট্রাক উল্টে যাচ্ছে।’
বাংলাহিলি কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র জামিল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘ভারতীয় ব্যবসায়ীরা পত্র দিয়ে স্থলবন্দরের প্রধান সড়কটির বেহাল দশার কথা আমাদের জানিয়েছেন। পত্রে তারা স্থলবন্দরের রাস্তাটি দ্রুত চলাচলের উপযোগী করার কথা তারা বলেছেন। আর যদি তা করা না হয় তাহলে তারা বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বন্ধসহ বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়টি মৌখিকভাবে আমাদের জানিয়েছেন। আমরা এরইমধ্যে তাদের পত্র দেয়ায় বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মাসুদ রানা বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে সড়কে কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। তার পরও কাজ চলছে। সড়কে ছোট-বড় গর্তসহ অন্য যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে আশা করছি আগামী দু-তিনদিনের মধ্যে সেগুলো সমাধান করতে পারব।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগ দিনাজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মনসুরুল আজিজ বলেন, ‘হিলি স্থলবন্দরের সড়কটি ২ কিলোমিটার এলাকা ফোর লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০০ মিটার সড়কের দুই লেনের কাজ শেষ করেছে। আশা করছি, শিগগিরই বাকি কাজ শেষ হলে সড়কের এক পাশ খুলে দিতে পারব। এখনো ঠিকাদারকে পুরো জায়গা বুঝিয়ে দিতে পারিনি। ভূমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই বাকি কাজটুকু শেষ করতে পারব।’










