আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ও নৌকা মার্কা ভোট পেলে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখনই সরকারে এসেছে, এ রংপুরে কখনো মঙ্গা হয়নি। রংপুরে কখনো খাদ্যের অভাব দেখা দেয়নি। দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারে এলে, নৌকা মার্কা ভোট পেলে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয় সেটা আমরা প্রমাণ করেছি।’

রংপুরের কাচারী বাজার রোডে জিলা স্কুল মাঠে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিভাগীয় সমাবেশে গতকাল তিনি এসব কথা বলেন। রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ডা. দেলোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ এইচএন আশিকুর রহমান। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের        আহ্বায়ক একেএম শাহাদাত হোসেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘যখন ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেছিলাম, তখন মঙ্গা ছিল না, কিন্তু ২০০১ সালে যখন ওই খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসে, দুই হাতে টাকা-পয়সা লুট করে। সে ও তার ছেলেরা মিলে এ দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। আবার দেশে মঙ্গা শুরু হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমরা সরকার গঠন করি। তারপর থেকে আমি যে পদক্ষেপ নিয়েছি, এরপর এ দেশের মানুষের কোনো কষ্ট হয়নি।’

আওয়ামী লীগ মানুষের কল্যাণে কাজ করে মন্তব্য করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘অনেকেই তো ক্ষমতায় ছিল, এ রংপুরের ভাগ্য পরিবর্তনে কেউ কাজ করেনি। খালি নৌকা মার্কা ক্ষমতায় আসলেই কাজ হয়। নৌকা মার্কা ছাড়া হয় না। নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আপনারা স্বাধীনতা পেয়েছেন। আজকে দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে, হতদরিদ্র নেই বললেই চলে; মাত্র ৫ শতাংশ। আল্লাহর রহমতে সেটুকুও থাকবে না।’

উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা কষ্ট করে বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন। হয়তো এ মাঠ ছোট, ধরছে না। আমি আসার সময় দেখলাম রাস্তায় অনেক মানুষ। অনেক দূরে যারা অবস্থান করছেন, হয়তো চোখের দেখা দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু আমি এটুকু বলতে পারি, আপনারা আছেন আমার হৃদয়ে। আমি হৃদয় দিয়ে আপনাদের ভালোবাসা উপলব্ধি করি। বাবা-মা-ভাই সব হারিয়েছি। আমার তো হারাবার কিছু নেই। একটা মানুষ আপনজন হারালে শোক সইতে পারে না। আর আমি একই দিনে সব হারিয়েও শুধু একটা প্রতিজ্ঞা নিয়ে এসেছি, এ বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মুখে অন্ন জোগাব, প্রতিটি মানুষের ঘর করে দেব, প্রতিটি মানুষের জীবনমান উন্নত করব।’

তরুণরা আগামীর বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নৌকা মার্কা ক্ষমতায় আছে বলে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ গেছে। আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। কাজেই নৌকায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে আবারো আপনারা আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন—সেটাই আমি আপনাদের কাছে চাই। আপনারা নৌকায় ভোট দেবেন তো, বলেন? আমি এটুকু বলতে পারি, বাবা-মা, ভাই সব হারিয়েছি। বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের জনগণ, এটাই তো আমার সংসার, এরাই আমার আপনজন। আপনাদের মাঝে খুঁজে পাই আমার বাবার স্নেহ, ভাইয়ের স্নেহ, বোনের স্নেহ—আপনাদের মাঝ থেকেই আমি সব পেয়েছি। কাজেই আপনাদের জন্য যদি প্রয়োজন হয়, এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বাবার মতো জীবন দিতেও আমি প্রস্তুত। সেই কথাটাও আপনাদের জানিয়ে দিয়ে যেতে চাই।’

উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের বিস্তারিত তুলে ধরে রংপুরবাসীর উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি খালি হাতে আসিনি। আমি কতগুলো প্রকল্প উদ্বোধন করেছি। আপনাদের উন্নয়ন যাতে ত্বরান্বিত হয়, সেজন্য এগুলো করেছি। বগুড়া, রংপুর, সৈয়দপুর গ্যাস লাইন করছি। আপনাদের দীর্ঘদিনের গ্যাসের দাবি ছিল। আমরা প্রত্যেক এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের প্রতিটি কাজের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের মানুষের উন্নতি ও ভাগ্যের পরিবর্তন করা। একটা কথা বলতে পারি, এ অঞ্চলে আর কখনো দুর্ভিক্ষ ও মঙ্গা দেখা দেবে না। আমরা সেভাবেই উন্নয়ন করছি।’

লালমনিরহাটে বঙ্গবন্ধু এভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রসঙ্গ টেনে সরকারপ্রধান বলেন, ‘একদিন আমাদের মানুষ চাঁদেও যাবে। প্লেন বানাতে পারবে। সেই শিক্ষা সেখানে হবে।’

২৭টি প্রকল্প উদ্বোধনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এগুলো রংপুর বিভাগের জন্য আমার উপহার হিসেবে দিয়ে গেলাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাংলায় কোনো মানুষ ঠিকানাবিহীন থাকবে না, সেটাই আমাদের সিদ্ধান্ত। আমরা চাই আমাদের দেশ এগিয়ে যাক। এখানে একটা গোষ্ঠী আছে। যারা সব সময় বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলে। জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই খেলা শুরু হয়েছিল। বারবার ক্ষমতা দখল, হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি হয়েছে। আমরা অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আন্দোলন করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছি। মানুষ শান্তিমতো এখন ভোট দিতে পারে। ভোট দেয়ার জন্য আমরা ছবিসহ ভোটার তালিকা করেছি। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স করেছি, যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সবাই ভোট দিতে পারে।’

রংপুরবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘এখানকার জমি সোনার জমি। ভালো ফসল হয়। সবার কাছে আমার অনুরোধ, আমাদের মাটি আছে, উর্বর মাটি, সোনার ফসল ফলে। আমাদের এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে। যে যা পারেন চাষ করবেন। আপনারা গাছ লাগাবেন। অন্তত চারটি করে গাছ লাগাবেন। যার যতটুকু জমি আছে ফসল ফলাবেন। কোনো জমি যেন ফেলে রাখা না হয়।’

প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি খাতের মাধ্যমে রংপুর সুগার মিল চালু করার প্রতিশ্রুতি দেন। ভবিষ্যতে এ বিভাগের জন্য একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার প্রতিশ্রুতিও দেন। রংপুরসহ প্রতিটি বিভাগের জন্য খাদ্য সংরক্ষণাগার নির্মাণের উদ্যোগের কথা জানান সরকারপ্রধান। 

তিনি বলেন, ‘আমি চাই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সবকিছু সমানভাবে উন্নতি হোক। সেই লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। উন্নত বিশ্বও হিমশিম খাচ্ছে। সবকিছুর দাম বেড়েছে। এ অবস্থায়ও আমরা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছি। আওয়ামী লীগ আসে মানুষের উন্নতি করতে। আমরা দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছি এবং করে যাব।’

তারেক রহমান ও জোবাইদা রহমানের মামলায় শাস্তির প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাদের দুর্নীতির মামলা। এ মামলা তো আমরা করিনি। তাদের প্রিয় ‘ইয়েস উদ্দিন-ফখরুদ্দীন’ করেছে। সেই মামলায় তারা শাস্তি পেয়েছে। তারা দেশ ধ্বংস করে। আমরা সৃষ্টি করি।’

এর আগে রংপুরে ২৭টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটারসহ আরো পাঁচটি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এসব প্রকল্প বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন হবে।

যেসব প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম-কমিশন সচিবালয়ের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়, রংপুর জেলার বিট্যাক সেন্টার, রংপুর মেডিকেল কলেজের মহিলা হোস্টেল এবং বিএমডিএর আঞ্চলিক অফিস।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে তার মধ্যে রয়েছে শেখ রাসেল মিডিয়া সেন্টার, শেখ রাসেল ইনডোর স্টেডিয়াম, শেখ রাসেল সুইমিংপুল, রংপুর পালিছড়া স্টেডিয়াম এবং বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স। এছাড়া রংপুর সিটি করপোরেশনের অধীনের প্রকল্পগুলো হলো রংপুর সিটি সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাল, রংপুর সিটি অ্যাসফল্ট প্লান্ট ও স্টোর ইয়ার্ড।

এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনের প্রকল্পগুলো হলো নলয়া নদী পুনর্খনন (১৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটার), আলাইকুমারী নদী পুনর্খনন (১৯ দশমিক ২৪ কিলোমিটার), নইমুলা বিল পুনর্খনন (১৪ দশমিক ৫৭ একর), চিথলী ফিল পুনর্খনন (১৯ দশমিক ৬৩ একর), ভারারদহ এবং পটুয়াকামরি বিল পুনর্খনন (২৮ দশমিক ৮৯ একর)।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে পীরগাছা উপজেলা চৌধুরানী জিসি থেকে সাঠিবাড়ী আরঅ্যান্ডএইচ পর্যন্ত রাস্তার উন্নয়নকাজ, পীরগাছা উপজেলা ভেন্ডাবাড়ী থেকে খালাশপীর জিসি পর্যন্ত রাস্তার সংস্কারকাজ, কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর জিসি থেকে পাওতানা জিসি পর্যন্ত সড়কের সংস্কারকাজ, মিঠাপুকুর উপজেলার গোপালগঞ্জ ঘাটে ঘাঘট নদীর ওপর ৯৬ মিটার সেতু নির্মাণ, গঙ্গাচড়া উপজেলার বুড়িরহাট জিসি-কাকিনা আরঅ্যান্ডএইচ সড়কের ৪০ মিটার সেতু নির্মাণ এবং পল্লীমারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বনাম কাউনিয়া উপজেলার আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণকাজ।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের আওতাধীন প্রকল্পগুলো হলো রংপুর মেডিকেল কলেজ বহুমুখী ভবন, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় হেলেঞ্চা ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, রংপুর বিভাগের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়, রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় মাথারগঞ্জ ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় ১৪ নং চতরা ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের ১০ শয্যাবিশিষ্ট বেগম রোকেয়া আধুনিক হাসপাতাল এবং পীরগঞ্জ উপজেলায় খালাশপীর ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র।