নভেল করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় পর্যায়ে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে দেশজুড়ে লকডাউন চলছে। এ কারণে দেশের ফ্লাওয়ার মিলগুলোর আটা-ময়দা উৎপাদন কমে অর্ধেকে নেমেছে। হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় আটা-ময়দার চাহিদা কমার প্রভাব পড়েছে পশুখাদ্যের বাজারে। সরবরাহ সংকটের কারণে গত দুই মাসে দেশে পশুখাদ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।

কোরবানির ঈদের আগে এমনিতে পশুখাদ্যের চাহিদা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই পশুখাদ্যের বাজারও ঊর্ধ্বমুখী থাকে। কিন্তু আসন্ন ঈদুল আজহার আগে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ কম থাকায় ক্রমেই বাড়ছে পশুখাদ্যের দাম। তাছাড়া বর্তমানে দেশের কোরবানির চাহিদার প্রায় শতভাগ দেশীয় পশু দিয়ে মিটছে। এতে পশুখাদ্যের চাহিদাও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। মূলত গম থেকে পশুখাদ্যের বেশির ভাগ সরবরাহ থাকায় দেশের বাজারে হঠাৎ সংকট বেড়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের মেসার্স আলী ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী মো. আশরাফ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, দেশীয় ফ্লাওয়ার মিলগুলোতে গম থেকে আটা উৎপাদন কমে যাওয়ায় ভুসিসহ বিভিন্ন পশুখাদ্য উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। কোরবানির ঈদের আগে পশুখাদ্যের চাহিদা আগের তুলনায় বাড়লেও সরবরাহ কম থাকায় টানা দুই মাস পশুখাদ্যের দাম বেড়েই চলেছে। তবে বেশকিছু দেশ থেকে আমদানি হওয়া পশুখাদ্য বাজারে সরবরাহ শুরু হলে দাম কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন আড়তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় চিকন ভুসি হিসেবে পরিচিত পশুখাদ্য বস্তাপ্রতি (৫৫ কেজি) ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে দাম বেড়ে ১ হাজার ৮৫০ টাকায় উঠে গেছে। এছাড়া পাতা ভুসির দাম বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ৯০০ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৪৬০ টাকায়, ভুট্টা কেজিপ্রতি ১৫ থেকে বেড়ে ২৫, খৈল বস্তাপ্রতি ১ হাজার ৭০০ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩০০ ও ধানের কুঁড়া বস্তাপ্রতি (৪০ কেজি) ৫০০ থেকে বেড়ে ৮৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কেজিপ্রতি সয়াবিন আগে ৩০-৩২ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে ৪৭ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ফ্লাওয়ার মিলগুলোর উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসায় দেশীয় পশুখাদ্য উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায় বাজার আরো বেশি অস্থির হয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে দেশে পশুখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক শিপিং চার্জ বেড়ে যাওয়াকেও দায়ী করেছেন ব্যবসায়ীরা। মূলত গত ছয় মাসে জাহাজের ভাড়া প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় চাহিদা অনুপাতে সরবরাহ কম হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে চীনমুখী জাহাজ বুকিংয়ের কারণে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পণ্য পরিবহনের জন্য জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু শিপিং লাইন বাংলাদেশে আসার আগ্রহ দেখালেও দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া দাবি করছে। যার কারণে আমদানিনির্ভর অধিকাংশ পশুখাদ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। দেশীয় উৎপাদন দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব না হওয়ায় চাহিদা মৌসুমকে সামনে রেখে দেশে পশুখাদ্যের বাজার আগামী কয়েক মাস ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

এগ্রোটেক পোলট্রি অ্যান্ড অ্যানিমেল ফুডের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মো. শাহজালাল বণিক বার্তাকে বলেন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশে পশুখাদ্যে সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে। এক বছর আগেও প্রতি টন পণ্যের শিপিং চার্জ ৫০০ ডলার ছিল। বর্তমানে চীনের আমদানি বৃদ্ধির প্রবণতায় শিপিং চার্জ তিন গুণ বেড়ে গেছে। এতে আমদানি মূল্যের চেয়ে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। তবে নতুন মৌসুমে ধান কাটা শুরু হওয়ায় কয়েক মাসের মধ্যে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় পশুখাদ্য বেশির ভাগ ভুট্টা আমদানিনির্ভর। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকেই এসব ভুট্টা সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকেও কিছু ভুট্টা আমদানি হয়। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্বিতীয় দফায় বেড়ে যাওয়ার কারণে বিশ্ববাজার থেকে ভুট্টা সংগ্রহ ধীরগতিতে হচ্ছে। ফলে চাহিদা অনুপাতে সরবরাহ না থাকায় পণ্যটির দাম বেড়েই চলেছে। কানাডা থেকে ভুসি আমদানি হলেও বর্তমানে শিপিং কোম্পানিগুলোর চীননির্ভর বুকিংয়ের কারণে দেশে যেকোনো পণ্য আমদানিতে দ্বিগুণেরও বেশি সময় লাগছে। তাছাড়া পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচও বেড়ে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের পশুখাদ্যের বাজারে। এসব কারণে আসন্ন কোরবানির মৌসুমে পশুর দাম স্বাভাবিকের তুলনায় বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।