রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল গত বছরের ৩০ জুন গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর বেসরকারি পর্যায়ে ইজারার মাধ্যমে বন্ধ এসব পাটকল চালুর পরিকল্পনা নেয়া হয়। তবে সরকারি পর্যায়ে কার্যক্রম বন্ধ হলেও বিজেএমসির কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। সম্প্রতি বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) তত্ত্বাবধানে সীমিত আকারে ইজারার মাধ্যমে বন্ধ পাটকল চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে দেশের প্রায় প্রতিটি বন্ধ পাটকল পরিদর্শন করেছেন সারা দেশের একাধিক বেসরকারি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ ঘোষণার পর শুরুতে প্রায় ৮০ হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকের পাওনা পরিশোধে কার্যক্রম শুরু করে বিজেএমসি। বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিকের ৯০ শতাংশ পাওনা পরিশোধও করে দেয়া হয়। এরপর গত ২২ ডিসেম্বর বিজেএমসির বন্ধ মিলগুলো ভাড়াভিত্তিক ইজারা পদ্ধতিতে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পুনঃচালুর বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র উপসচিব মো. ইমরান আহমেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) এসএম সেলিম রেজাকে আহ্বায়ক করা হয়। নয় সদস্যের আন্তঃমন্ত্রণালয় ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিজেএমসির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রউফ। কমিটি এরই মধ্যে সরকারি কর্তৃত্ব রেখে বন্ধ পাটকলগুলো ইজারা প্রদানের নীতিমালা ও শর্ত চূড়ান্ত করেছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে শিগগিরই ইজারা-সংক্রান্ত দরপত্রে যাবে বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ।
বর্তমানে বিজেএমসির কর্মরত লোকবলের সংখ্যা ২ হাজার ৯৫৪ জন। এর মধ্যে কর্মচারী ১ হাজার ৯০২ জন এবং কর্মকর্তার সংখ্যা ১ হাজার ৫২ জন। শুরুতে বিজেএমসি বিলুপ্তি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ইজারা-সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ায় সেখানে বিজেএমসিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকল বেসরকারি মালিকানায় পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থায় রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ সংস্থায় দক্ষ লোকবল নিয়োগ ছাড়াও পাট খাতের একটি তদারককারী সংস্থায় পরিণত করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।
বিজেএমসির ইজারা নীতিমালা সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া ২৫টি পাটকলের সর্বমোট জমির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২৩৪ একর। বেসরকারি মিলমালিকদের বিপুল এ জমির প্রয়োজন হবে না। সরকারি মিলের ক্ষেত্রে শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের আবাসন, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ অব্যবহূত অনেক জমি ছিল। বেসরকারি খাতে শুধু উদ্যোক্তাদের কাছে চাহিদামতো জমি ও ভবন ছেড়ে দেয়া হবে। পাশাপাশি বিজেএমসির মালিকানাধীন মিলের অফিস ভবনও ইজারা গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে ছেড়ে দেয়া হবে। বিজেএমসি মিলের অভ্যন্তরে নতুন স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য তদারককারী অফিস স্থানান্তর করবে।
বিজেএমসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিজেএমসির স্থাবর এ স্থাপনাগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক স্থাপনা, বহুতল ভবন নির্মাণ ও ভাড়া প্রদানের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি অব্যবহূত জমি কৃষি ও বাণিজ্যিকভাবে ইজারা প্রদান করে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো হবে। ফলে ইজারার মাধ্যমে সরকারি জমি নিয়ে অপব্যবহার রোধ, বেদখল হয়ে যাওয়া রোধ এবং বেদখল ভূমি উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিজেএমসি কর্মকর্তারা।
বন্ধ পাটকল ইজারা প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে বিজেএমসির চেয়ারম্যান ও ইজারা-সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য সচিব মো. আবদুর রউফ বণিক বার্তাকে বলেন, বিজেএমসি ইজারা-সংক্রান্ত বিষয়ে নীতিমালা, শর্ত ও আনুষঙ্গিক নথি চূড়ান্ত করেছে। সরকারের সবুজসংকেত পেলেই ইজারা প্রদানের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে। মিল পর্যায়ে এক্সপ্রেস অব ইন্টারেস্ট (আগ্রহ ব্যক্তকরণ) পাওয়ার পর একটি শর্টলিস্ট প্রস্তুত করা হবে। বাছাইকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রস্তাব গ্রহণের পর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে মূল্যায়ন শেষে চূড়ান্তভাবে পাটকলগুলো বেসরকারি উদ্যোক্তার কাছে ইজারা দেয়া হবে।
জানা গেছে, সরকারি পর্যায়ে পাটকল বন্ধ হলেও বিজেএমসির কার্যক্রম বন্ধ হবে না। প্রতিটি মিলে বেসরকারি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী জমি ও ভবন ইজারা দেয়া হবে। বিজেএমসির টেকনিক্যাল টিম ইজারাকৃত পাটকলে একটি অফিস করবে। বিজেএমসির মিল এলাকায় স্থানীয় অফিসের কাছে বেসরকারি মিল কর্তৃপক্ষ রিপোর্ট করবে। পাশাপাশি পাটকল ও পাটজাতীয় পণ্য উৎপাদন-সংক্রান্ত বিজেএমসির পুরনো দক্ষতাকে কাজে লাগাতে সহায়তা নিতে পারবে ইজারা গ্রহীতা প্রতিষ্ঠান। সেক্ষেত্রে দেশের ২৫টি মিল এলাকায় বিজেএমসি একটি টেকনিক্যাল টিম বেসরকারি মালিকানায় পরিচালিত মিলের উৎপাদন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারিভাবে যুগের পর যুগ লোকসানে থাকায় পাট খাতের উন্নয়নে নতুন ধরনের পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা পাট খাতের উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রমে থাকবে। অপরদিকে গবেষণা, দক্ষতা ও নীতি দিয়ে সহায়তা করবে সরকার। বিজেএমসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মনিটরিং করতে এরই মধ্যে নতুন একটি প্রকল্প চালু করতে যাচ্ছে বিজেএমসি। ফলে সরকারি সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে ইজারা নিয়ে অপব্যবহার রোধ করার মাধ্যমে পাট খাতের বিকাশে বিজেএমসি আগের চেয়েও অনেক বেশি ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ।
বিজেএমসির মালিকানাধীন পাটকলের সংখ্যা ২৫টি। এর মধ্যে ২২টি পাটকল ও তিনটি নন-জুট মিলস। এছাড়াও মনোয়ার জুট মিলস দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। মিলগুলোর মধ্যে ঢাকার ছয়টি মিলের মোট ভূমি ৩৬৭ একর (জুট ফাইবার গ্লাস ফ্যাক্টরি ছাড়া), চট্টগ্রামের আটটি মিলের ভূমি ৩৩৫ একর এবং খুলনার নয়টি মিলের মোট ভূমির পরিমাণ ৫০৭ একর। পাটকল পরিচালনায় প্রায় ১ হাজার ২০০ একরের বেশি জমির প্রয়োজন হবে না বিধায় সরকারের কর্তৃত্ব রেখেই সীমিত ইজারা পদ্ধতিতে বন্ধ পাটকলগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দিতে চাইছে বলে জানিয়েছে বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ।









