বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এ মুহূর্তে চারটি ফ্লাইওভার দিয়ে গণপরিবহন চলাচল করে। যানবাহনের চাপ, অতিবৃষ্টি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবসহ নানা কারণে ফ্লাইওভারগুলোর অবস্থা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। ঘটছে নানা দুর্ঘটনাও। এসব ফ্লাইওভারের নির্মাতা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) হলেও  দেড় বছর ধরে এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে এগুলো রক্ষণাবেক্ষণে তাদের দৃশ্যত কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। তারা বলছে, কভিড-বৃষ্টিসহ বিভিন্ন কারণে মেরামত করা হয়ে ওঠেনি।

স্টেশন রোড থেকে কদমতলী পথে নির্মিত হয় চট্টগ্রামের ফ্লাইওভার। এক লেনের এ ফ্লাইওভারটির উভয় পাশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করে। ফলে এমনিতেই ঝুঁকিতে থাকে চলাচলরত যানবাহনগুলো। তার ওপর দীর্ঘদিন পরিচর্যা না করা, বিটুমিনের প্রলেপ উঠে যাওয়ায় খানাখন্দে পরিণত হয়েছে ফ্লাইওভারটির বিভিন্ন অংশ। বর্ষা মৌসুমে ভারী যানবাহনের চাপে এর উভয় পাশের প্রবেশমুখে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে স্টেশন রোড এলাকার প্রবেশমুখে বড় একাধিক গর্তে বৃষ্টির পানি জমে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে এসব বড় গর্ত তৈরি হলেও চসিকের পক্ষ থেকে সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বড় গর্তগুলোর ওপর কাঠের গুঁড়ি বসিয়ে যানবাহনকে সতর্ক করেই দায় সেরেছে চসিকের প্রকৌশল বিভাগ। এসব গর্তে পড়ে গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকটি যানবাহন দুর্ঘটনার মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

একই অবস্থা অন্য ফ্লাইওভারগুলোরও। সরেজমিনে দেখা গেছে, ফ্লাইওভারগুলোর অনেক স্থানে রেলিংয়ের পাইপ, স্ট্রিট লাইটসহ বিভিন্ন সামগ্রী চুরি হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ফ্লাইওভারের সড়ক বাতির আলো জ্বলে না। ফ্লাইওভারের সড়কের বিভিন্ন অংশের বিটুমিন উঠে যাওয়ায় খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। যার কারণে গার্ডারও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে ফ্লাইওভারের মূল কাঠামোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

এ বিষয়ে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, করোনাকালে লকডাউনের কারণে চট্টগ্রাম শহরের সড়ক ও ফ্লাইওভার মেরামতের কোনো কাজ করা যায়নি। তাছাড়া এখন যেহেতু বর্ষা মৌসুম, তাই সংস্কারকাজের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন শহরের সড়কগুলোও ওয়াসার প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে কেটে রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে বৃষ্টি কমে এলে সড়ক মেরামত ও ফ্লাইওভারের বিভিন্ন সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।

সিডিএর একটি সূত্র জানিয়েছে, নগরীতে ৯২৭ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত চারটি ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চসিককে হস্তান্তর করা হয়। মূলত ফ্লাইওভারগুলো নির্মাণ করলেও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত খাত ছিল না সিডিএর। আর সে কারণেই এগুলো চসিককে হস্তান্তর করা হয়। এমনকি সিডিএর অধীনে থাকার সময়ও এগুলো তেমন রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে চসিকের পক্ষ থেকে ফ্লাইওভারগুলো পরিচালনার জন্য দাবি জানানো হলে শেষ পর্যন্ত সিডিএ এগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়। কিন্তু চসিকের অধীনে আসার পরও ফ্লাইওভারগুলোর ভাগ্য ফেরেনি।

এ বিষয়ে সিডিএর প্রকৌশল বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, এসব ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিডিএর আলাদা কোনো খাত ছিল না। এজন্য সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু চসিকের কাছে যাওয়ার পরও ফ্লাইওভারগুলো সঠিক রক্ষণাবেক্ষণে গতি আসেনি। কার্পেটিং উঠে গেলে, গার্ডারের ওপর যানবাহনের চাপ বাড়লে ফ্লাইওভারগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। এতে আয়ুষ্কাল কমে যেতে পারে।

জানা গেছে, সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দেয়ার আগে ফ্লাইওভারগুলোতে যানবাহন চলাচলে যাতে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয়, সে বিষয়ে উভয় সংস্থার প্রতিনিধিরা পরিদর্শন করেন। ফ্লাইওভারের রেলিং, বৈদ্যুতিক লাইট ও সংযোগ, কার্পেটিংসহ পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা পরিদর্শন করে সম্ভাব্য ত্রুটিগুলো সারিয়ে চসিকের কাছে হস্তান্তর করে সিডিএ। চসিকের অধীনে আসার পর নিয়মিতভাবে এগুলোর আবর্জনা ও বালি অপসারণে চসিকের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা কাজ করছেন। কিন্তু অবকাঠামোগত সংকটগুলোর বিষয়ে চসিকের অবহেলা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর চট্টগ্রামের দীর্ঘতম আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় ৬৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারটি চার লেনের। ২০১৫ সালের মার্চে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর এটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। এছাড়া ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নগরীর শুলকবহর থেকে বহদ্দারহাট এক কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত এমএ মান্নান ফ্লাইওভার প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তদারকিতে নির্মাণকাজ শেষে ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর ফ্লাইওভারটি উদ্বোধন করা হয়। নগরীর বটতলী স্টেশন থেকে ডিটি (ঢাকা ট্রাঙ্ক) রোডের ধনিয়ালাপাড়া পর্যন্ত ফ্লাইওভারটি ৫৮ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১২ সালের জুলাইয়ে নির্মাণকাজ শুরু হয়। এর উদ্বোধন হয় ২০১৫ সালের ৬ ডিসেম্বর। নগরীর দেওয়ানহাট ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১১ সালে। প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এর নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১২ সালে এবং এটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় ২০১৩ সালে।