বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) পাঁচজন কর্মী নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটের বিভিন্ন ফেরিতে কাজ করতেন তারা। সবাই আক্রান্ত হয়েছেন গত এক সপ্তাহের মধ্যে। এ সময়ে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাট দিয়ে ফেরিতে করে ঢাকায় এসেছেন হাজার হাজার শ্রমিক। এ শ্রমিকদের কারো মাধ্যমেই বিআইডব্লিউটিসির কর্মীরা নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর ফেরিগুলোতে মানুষ যেভাবে গাদাগাদি করে এসেছে, তাতে নভেল করোনাভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন ফেরি পার হয়ে ঢাকায় ফেরা হাজার হাজার শ্রমিক।
ঘাটের ফেরি কর্মীদের মধ্যে প্রথম নভেল করোনাভাইরাস ধরা পড়ে গত ২৬ এপ্রিল। সেদিন দুই কর্মীর শরীরে কভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার কথা জানান গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা। এর আগেই আক্রান্ত কর্মীদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। ফলাফল আসার পর কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয় তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের। দুই কর্মীর নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের আরো ২০ কর্মীর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ৩০ এপ্রিল এসব নমুনার ফলাফল আসে, তাতে নতুন করে আরো তিনজনের শরীরে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে।
নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে চলছে সাধারণ ছুটি। গণপরিবহনের মতো একই দিন থেকে বন্ধ রয়েছে অভ্যন্তরীণ নৌপথে যাত্রী পরিবহন। কেবল নিত্যপণ্য ও জরুরি পরিষেবার নৌযান এবং ফেরিগুলো চালু রাখা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ফেরিতে করে যানবাহনের পাশাপাশি প্রচুর মানুষও পারাপার হচ্ছে। এসব মানুষের মাধ্যমেই বিআইডব্লিউটিসির কর্মীরা নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।
বণিক বার্তার রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষ এ ঘাটটি ব্যবহার করে। গত সপ্তাহ থেকে গার্মেন্টসগুলো খুলে দেয়ায় এসব জেলা থেকে প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ শ্রমিক ঢাকায় গিয়েছেন। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় পণ্যবাহী গাড়ি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজি অটোরিকশা, ভ্যানের মতো যানবাহনে করে তারা দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আসেন। ফেরিতে পদ্মা পাড়ি দিয়ে ফের একই ধরনের যানবাহনে চেপে ঢাকায় যাচ্ছেন শ্রমিকরা।
এদিকে ২৬ মার্চের সাধারণ ছুটির পর থেকে ফেরি চলাচলও কিছুটা কমিয়ে এনেছে বিআইডব্লিউটিসি। বর্তমানে ফেরি চলছে মাত্র ছয়টি। ফেরির সংখ্যা কম থাকায় গত এক সপ্তাহ ধরে চলাচল করা প্রতিটি ফেরিতেই ছিল উপচে পড়া মানুষ, যার প্রায় সবাই ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন পোশাক কারখানার কর্মী। সামাজিক দূরত্ব তো দূরের কথা, নিরুপায় শ্রমিকরা ফেরিতে উঠেছেন গাদাগাদি করে। একই তথ্য দিয়েছেন গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুনও।
গত সপ্তাহে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের পাঁচজন কর্মী নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আর গত সপ্তাহেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শ্রমিক ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে ফিরেছেন, যাদের একটা বড় অংশ ব্যবহার করেছে এ নৌরুটটি। বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তাদের ধারণা, ফেরি পার হওয়া পোশাক শ্রমিকদের মাধ্যমেই সংস্থাটির কর্মীরা নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। শুধু বিআইডব্লিউটিসির কর্মীই নন, যারা গত এক সপ্তাহে ফেরিতে গাদাগাদি করে ঢাকায় ফিরেছেন, তাদের প্রায় সবাই নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বলে মনে করছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক আবু আব্দুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে এখন পর্যন্ত একটা কথাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তা হলো সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলাচল করা। কিন্তু ফেরিতে করে মানুষ যেভাবে পারাপার হচ্ছে, তাতে কোনোভাবেই এ সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে একদিকে গাদাগাদি করে যাওয়া মানুষ যেমন করোনা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন, তেমনি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন আমাদের কর্মীরাও। এরই মধ্যে আমাদের পাঁচ কর্মী ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে বর্তমানে সবার মধ্যে এক ধরনের আতঙ্কও কাজ করছে।
তিনি জানান, নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমরা ফেরি চলাচল সীমিত রেখেছি। বর্তমানে মাত্র ছয়টি ফেরি পরিচালনা করা হচ্ছে। জরুরি যানবাহন ও নিত্যপণ্যবাহী গাড়িগুলো আমরা পারাপার করছি। তবে যাত্রী পারাপার বন্ধ রাখার বিষয়ে আমাদের কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি।









