শিল্প পুলিশের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অঞ্চলের মোট ১ হাজার ৬৭৬ কারখানার মধ্যে অন্তত ৬৬টিতে ঈদকে ঘিরে বেতন-বোনাস ও ছুটি নিয়ে জটিলতার আশঙ্কা ছিল। এর মধ্যে ১৬ কারখানা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ করায় এখনো ৫০ কারখানা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাকি থাকা ৫০ কারখানার মধ্যে ১৬টিকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ১৪টিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ২০টিকে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কারখানার অনেকগুলো ফেব্রুয়ারির বেতন, মার্চের আংশিক বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ করতে পারবে না বলে জানিয়েছে মালিক পক্ষ। ফলে ঈদের আগে শ্রমিক অসন্তোষ বা আন্দোলনের আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত ৬৬ কারখানার মধ্যে ১২ মার্চ পর্যন্ত ফেব্রুয়ারির বেতন পরিশোধ করেছে মাত্র সাত প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে অন্তত ছয় কারখানা চলতি মাসে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে পারবে না বলে জানিয়েছে।
ছয় কারখানা হলো জেএমএস গার্মেন্টস লি., থিয়ানিল অ্যাপারেলস লিমিটেড, টয় উড (বিডি) কোম্পানি লিমিটেড, এমএনসি অ্যাপারেলস লিমিটেড, ম্যাক্সিম ফ্যাশন লিমিটেড ও সীতাকুণ্ডের মার্স টেক্সটাইল লিমিটেড। এর মধ্যে প্রথম চারটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এলাকার মধ্যে অবস্থিত।
প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মরত ৫ হাজার ৭২৮ শ্রমিককে ফেব্রুয়ারির বেতন-ভাতা, মার্চের ১৫ দিনের বেতন এবং বোনাস কিছুই দিতে পারবে না মালিক পক্ষ। তবে বাকি কারখানাগুলো নিশ্চিত করেছে ফেব্রুয়ারির বেতন ঈদের আগে সুবিধাজনক সময়ে পরিশোধ করা হবে। সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য তারিখ দিয়েছে ১৮ মার্চ পর্যন্ত।
এ প্রসঙ্গে কারখানার মালিক ও মানবসম্পদ কর্মকর্তারা জানান, যেসব প্রতিষ্ঠানে বেতন পরিশোধে সমস্যা দেখা দিয়েছে তার বেশ কয়েকটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ঈদের পরও এসব পাওনা দ্রুত পরিশোধ করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে শিল্প পুলিশের আশঙ্কা, ঈদের আগে বকেয়া বেতন ও বোনাস না পেলে শ্রমিকরা কারখানা এলাকা কিংবা বেপজা কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেন।
অন্যদিকে মার্চের প্রথম ১৫ দিনের বেতন ঈদের পর পরিশোধ করার ঘোষণা দিয়েছে ৫৯ প্রতিষ্ঠান। বাকি সাত প্রতিষ্ঠান কবে এ বেতন-ভাতা দেবে সে সম্পর্কে নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। ফেব্রুয়ারির বেতন দিতে না পারা ছয় প্রতিষ্ঠানও এ তালিকায় আছে।
ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১০ প্রতিষ্ঠান ঈদের বোনাস পরিশোধ করেছে। এসব কারখানার মধ্যে রয়েছে—ডেনিম এক্সপার্ট লি., হেলা ক্লোথিং বাংলাদেশ লিমিটেড, প্রেজেন্টেশন অ্যাপারেলস লিমিটেড, জেএমআই গ্যাস, ইনফিনিয়া কম্পোজিট টেক্সটাইল লি., ইনফিনিয়া নিটিং অ্যান্ড ডাইং লি., ইনফিনিয়া সিনথেটিক ফাইবার লি., ইনফিনিয়া স্পিনিং মিলস, সানজি টেক্সটাইল লিমিটেড ও আটিস্টিক অ্যাপারেলস।
অন্যদিকে নয় প্রতিষ্ঠান তাদের শ্রমিকদের ঈদ বোনাস দিতে পারবে না বলে জানিয়েছে। এছাড়া আরো ছয় কারখানা বোনাসের আওতাভুক্ত নয়। যেসব প্রতিষ্ঠান বোনাস দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা ১৪-১৯ মার্চের মধ্যে তা পরিশোধ করবে বলে জানিয়েছে।
তবে শিল্প পুলিশের প্রতিবেদন বলছে, অনেক প্রতিষ্ঠান বোনাস কিংবা বেতন-ভাতার তারিখ ঘোষণা করলেও তাদের অনেকেই এ অর্থ শ্রমিকদের পরিশোধ করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে কারখানাগুলোয় শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটতে পারে।
বোনাস দেবে না এমন নয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে জেএমএস গার্মেন্টস লি., থিয়ানিল অ্যাপারেলস লিমিটেড, টয় উড (বিডি) কোম্পানি লিমিটেড, এমএনসি অ্যাপারেলস লিমিটেড, ম্যাক্সিম ফ্যাশন লিমিটেড, সীতাকুণ্ডের মার্স টেক্সটাইল লিমিটেড, রসুল অ্যাপারেলস, জেঅ্যান্ডজে ফ্যাশন লিমিটেড ও মেসার্স গেইন অ্যাপারেলস।
বোনাস না দেয়া প্রসঙ্গে মেসার্স গেইন অ্যাপারেলসের মানবসম্পদ কর্মকর্তা বৈষ্ণ বাবু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঈদের আগে ফেব্রুয়ারির বেতন দিতে হবে। বোনাস দিতে পারব কিনা বলতে পারছি না।’ যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি সাবকন্ট্রাক্টে কাজ করে এবং বর্তমানে পর্যাপ্ত কাজের অর্ডার না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানার কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, চট্টগ্রামের বেশির ভাগ কারখানা এখন সাবকন্ট্রাক্টে কাজ করে। পর্যাপ্ত অর্ডার না থাকা, শিপমেন্ট ও ব্যাংকিং জটিলতা, এলসি বন্ধ, আর্থিক সংকট, বায়ারদের থেকে সময়মতো পেমেন্ট না পাওয়া, কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতা, কাঁচামালের সংকটের কারণে কারখানাগুলো নানাবিধ সংকটের মধ্যে আছে।
এদিকে শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, রমজান শুরু হওয়ার আগেই তারা সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। কারখানাগুলোর অতীত ইতিহাস বিশ্লেষণ করে মালিকদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করা হয়েছে।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল-মাহমুদ বলেন, ‘আসন্ন ঈদের আগে শ্রমিকদের ফেব্রুয়ারির বেতন, মার্চের প্রথম ১৫ দিনের বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করতে মালিক পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। কারখানাগুলো সময় বেঁধে দিয়েছে। আমরাও চাই প্রতিষ্ঠানের মালিকরা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিক।’









