মানুষ নতুনকে পছন্দ করে। পছন্দ করে নতুনত্বের সংস্পর্শে গিয়ে শিখতে, জানতে এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করতে। যারা নতুনত্ব খুঁজতে চায় তাদের পথকে সহজ করে দেয় পূর্ববর্তীদের শেয়ার করা অভিজ্ঞতা। পুরনোদের অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে ’অ্যালামনাই টকস' নামে ধারাবাহিক এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস যেখানে অ্যালামনাইরা যুক্তরাষ্ট্রে তাদের অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং শ্রোতাদের প্রশ্নের উত্তরসহ নানা দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন।
১১ জুলাই (বৃহস্পতিবার) ঢাকার ইএমকে সেন্টারে ‘বাংলাদেশী কণ্ঠে আমেরিকার বৈচিত্র্য’ শিরোনামে একটি আলোচনা সভার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে একজন বাংলাদেশীর বয়ানে আমেরিকার কৃষ্টি-কালচার, জীবনযাত্রা এবং শিক্ষা-কার্যক্রম নিয়ে তার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে।
এই পর্বে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের তরুণ কূটনীতিবিদ ও পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি অফিসার ব্রেন ফ্লানিগানের পরিচালনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এবং ফুলব্রাইট ভিজিটিং স্কলার অ্যালামনাই ড. সামসাদ মর্তুজা যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর কীভাবে ফুলব্রাইট স্কলারশিপের জন্য মনোনীত হন, কীভাবে আমেরিকার বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও সখ্য গড়ে ওঠে এবং শিক্ষা-কার্যক্রমে তিনি কোন কোন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন তা শ্রোতাদের সামনে বর্ণনা করেন।
এ সময় তিনি আমেরিকান সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের মিলগুলো তুলে ধরেছেন।
শ্রোতাদের সামনে তিনি উল্লেখ করেন ফুলব্রাইট স্কলারশিপের জন্য মনোনীত হওয়ার অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, আমেরিকান এক লাইব্রেরিতে একবার আমেরিকান লেখক এন. স্কট মোমাদের লেখা বই 'হাউজ মেইড অফ ডাউন' পড়ছিলাম। যিনি ছিলেন পুলিৎজার বিজয়ী লেখক। তার লেখা বই পড়ে আমি ফুল ব্রাইট স্কলারশিপের জন্য আবেদন করি। পরে এন. স্কট মোমেদে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ফুলব্রাইট স্কলারশিপের জন্য মনোনীত হই।
আলাপচারিতায় ব্রেন ফ্লানিগান আমেরিকার পরিবেশ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের টুসান শহরের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও প্রকৃতি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, একদিন সাগুয়ারো ক্যাকটাস গাছে দেখি। বেশ লম্বা এই ক্যাকটাস গাছ। মনে হয়েছে আকাশ ছুঁতে চায় গাছটি। এই গাছ দেখলে আমার দেশের কথা মনে পড়ে যেত।
ওই শহরের প্রাণ-প্রকৃতি আমাকে বিমোহিত করত। এই অঞ্চলের মানুষদের খাদ্যাভ্যাস আমাদের দেশের মতোই। তারা আমাদের মতো চাল, ডাল, রুটি খায়। এসব বিষয় যখন দেখতাম তখন বাংলাদেশের কথা মনে পড়ত। একবার আমি এক গ্রামে যাই। যাওয়ার পর দেখি গ্রামের মানুষ আমাকে খুব উষ্ণভাবে গ্রহণ করল। আমাদের ভিতরে একটা ধারণা আছে যে, পশ্চিমারা আমাদের মতো অতিথিপরায়ণ নন। আমার এ ধারণা ভেঙে যায়, যখন আমি গ্রামে ঘুরতে যাই। আমরা বেশ কয়েকজন একসঙ্গে গিয়েছিলাম। আমাদের দেখে এলাকায় একটা উৎসবের মতো হয়ে গিয়েছিল, যেভাবে আমাদের গ্রামগুলোতে ভিনদেশী কেউ আসলে তাকে কেন্দ্র করে উৎসবের মতো হয়। আমি তাদের আধ্যাত্মিকতার চর্চা দেখেছি যেভাবে বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে ধর্মচর্চা হয়। আমাদের দেশে যেমন শেয়াল মামার গল্প প্রচলিত আছে তেমনি আমেরিকায় প্রচলিত রয়েছে কায়োটি উপকথা। আতিথেয়তা ও আধ্যাত্মিকতা বিবেচনায় বাংলাদেশের গ্রাম এবং আমেরিকার গ্রামগুলোর মধ্যে তেমন একটা পার্থক্য নেই। অনেকাংশেই আমাদের সংস্কৃতি ও আমেরিকান সংস্কৃতির মধ্যে মিল রয়েছে।
তিনি সেরি ইন্ডিয়ান একটি উপজাতি স্কুলে ইন্টার্ন করার সময়ের কথা স্মৃতিচারণ করেন। সে সময় তিনি স্কুলের শিশুদের সঙ্গে বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকতেন। শিক্ষার্থীদের আন্তরিকতা তাকে মুগ্ধ করে। তাদের সাথে তোলা ছবি নিয়ে একটা বইও বানিয়েছেন বলে জানান এই শিক্ষক। তিনি বলেন, যদিও তারা আমার নাম উচ্চারণ করতে পারত না কিন্তু তাদের সাথে সম্পর্কের ঘাটতি ছিল না।
সামসাদ মর্তুজা বলেন, আমি শিখেছি, পুরো পৃথীবিই একটি বই। এই বই পড়তে হলে আমাকে জানতে হবে বিভিন্ন তথ্য ও তত্ত্ব। তাই আমি রপ্ত করেছিলাম রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান, লোককথা এবং জাদুঘর বিজ্ঞান। এবং সমৃদ্ধ হয়েছে আমার চিন্তা চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি। একজন গবেষক এবং অ্যাকাডেমিক প্রশাসক হিসেবে দেখেছি, শুনেছি এবং নিজেকে বিকাশ করতে পেরেছি। ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন মানুষ আমাকে দেখিয়েছি জীবনের সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য।










