যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে রোগী বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতিদিনই এ হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে। গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৪৯৮ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। মেডিসিন, সার্জারি, প্রসূতি ও শিশু ওয়ার্ডে সবচেয়ে বেশি রোগী রয়েছে। যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই।
শয্যার অতিরিক্ত রোগীদের ঠাঁই হয়েছে ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায়। ঠাণ্ডার মধ্যে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণে রোগী ও স্বজনরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। হাসপাতালটিতে শয্যা সংখ্যা ২৫০, সেখানে রোগী থাকে গড়ে সাড়ে ৪৫০। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক-নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে চিকিৎসা ব্যবস্থায় রয়েছে নানা অনিয়ম। চিকিৎসকরা ঠিকমতো রাউন্ডে এসে রোগী দেখেন না। জুনিয়রদের দিয়ে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, শয্যা সংকটের কারণে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে তারা মেঝে ও বারান্দায় গাদাগাদি করে থাকছেন। এক রোগীর শরীরের সঙ্গে লেগে আছে আরেক রোগীর শরীর। তাদের সঙ্গে স্বজনের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ। ফলে পা ফেলার জায়গা নেই ওয়ার্ডগুলোয়।
হাসপাতালের মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে ১০ শয্যার বিপরীতে রোগী চিকিৎসাধীন ৫৩ জন। মেঝেতে শুয়ে আছেন ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পুরন্দপুর গ্রামের কালিচরণ বিশ্বাসের স্ত্রী বিনা রানী (৫৫)। পেটে ব্যথা, জ্বর নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি জানান, শয্যা খালি না থাকায় তাকে মেঝেতে থাকতে দেয়া হয়েছে। শীতের মধ্যে মেঝেতে থাকতে কষ্ট হচ্ছে তার। তার সঙ্গে থাকা কৃষ্ণা রানী জানান, অনেকটা বাধ্য হয়ে এমন পরিবেশে রোগীর চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে। আর্থিক অবস্থা ভালো হলে এখানে থাকতেন না।
যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া বকুলতলা এলাকার মোবারক দফাদারের স্ত্রী আয়েরা বেগম (৬৫) জানান, ভর্তি হওয়ার পর বলা হয়েছে শয্যা খালি নেই। তাই মেঝেতে থাকতে দেয়া হয়েছে। চিকিৎসাসেবার চেয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বেশি। শয্যার সঙ্গে জায়গা সংকটের কারণে টয়লেটের সামনেও থাকছেন রোগী ও স্বজনরা। ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকদের দেখা পাওয়া যায় না। ইন্টার্নরা এসে চিকিৎসা দেন।
মেডিসিন ওয়ার্ডের ইনচার্জ সেবিকা পারুল বিশ্বাস জানান, ছাড়পত্রের চেয়ে প্রতিদিন রোগী ভর্তির হার বেশি। প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন রোগী ভর্তি থাকে। এতসংখ্যক রোগী সামাল দিতে দায়িত্বরতদের হিমশিম অবস্থায় পড়তে হয়।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি ওয়ার্ডে শয্যার তুলনায় রোগী দ্বিগুণেরও বেশি। অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। টয়লেটগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে না। যে কারণে প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডের টয়লেট থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মুখে কাপড় দিয়ে রাখছেন টয়লেটের পাশে থাকা রোগীরা। প্রসূতি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, সিজারের পর অধিকাংশ রোগীকে মেঝে ও বারান্দায় রাখা হয়েছে। তারা ঝুঁকির মধ্যে থেকেই চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান জানান, শয্যার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি রোগীর চাপ রয়েছে। আমাদের ২৫০ শয্যা হলেও রোগী ভর্তি থাকে ৪৫০-৫০০ জন। যশোর জেলা বাদেও নড়াইল, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলা থেকে এ হাসপাতালে রোগী আসে। এখন ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা কমে গেলেও বেড়েছে মৌসুমিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগী। মাঝে মাঝে রোগীর চাপে এমন অবস্থা তৈরি হয় যে রোগী রাখার জন্য কোথাও তিল পরিমাণ জায়গা থাকে না। তার পরেও রোগী এলে ভর্তি না করে তো ফেরত পাঠানো যায় না। তিনি জানান, রোগীদের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনা করে প্রায় ওয়ার্ডে অতিরিক্ত শয্যা বসানো হয়েছে। চিকিৎসকরা নিয়মিত রাউন্ড দেন। তার পরও কোনো চিকিৎসকের দায়িত্ব অবহেলা থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।










