একদিকে যেমন মূলধারার সাংবাদিকতা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়া ও ‘ফটো কার্ডের’ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এ অসম প্রতিযোগিতা ও অপতথ্য ছড়ানোর ফলে দিন শেষে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

গতকাল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (এনএসইউ) ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া, কমিউনিকেশন ও জার্নালিজম (এমসিজে) বিভাগ এর আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। এনএসইউ উপাচার্য আবদুল হান্নান চৌধুরীর সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য দেন সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠনের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ড. সুসান ভাইজ, এনএসইউ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য এম এ কাশেম, বেনজীর আহমেদ, রেহানা রহমান, ইয়াসমিন কামাল, এনএসইউর উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নেছার ইউ আহমেদ।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকার ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ স্বাধীনতার দিকে এগোতেই হবে। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার সংজ্ঞা বদলে গেছে। এ পরিবর্তিত বাস্তবতায় ভারসাম্য না থাকলে সমাজ, অর্থনীতি ও সভ্যতার গতির সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হবে। চলমান ব্যবস্থায় ভারসাম্য না থাকলে সবাইকে বিপদে পড়তে হতে পারে।’

বর্তমান ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘আজকের দিনে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাব রয়েছে। ডিজিটাল হ্যাজার্ড ও অপতথ্য এখন বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে। এটি মোকাবেলায় কেবল আইন নয়, বরং সৃজনশীল জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। শুধু তথ্যের স্বাধীনতা নয়, মান নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।’ সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করতে হলে কিছু নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে বলে তিনি মত দেন।

নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। একদিকে যেমন মূলধারার সাংবাদিকতা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়া ও ফটো কার্ডের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।’ এ অসম প্রতিযোগিতা ও অপতথ্য ছড়ানোর ফলে দিন শেষে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে রাজনীতি সঠিক ধারায় নেই, তাই সাংবাদিকতা সংকটে পড়েছে। দেশের ৫৫ বছরের ইতিহাস আমার চোখের সামনের ঘটনা। এ পুরো সময়ে সাংবাদিকতা করছি। রাজনীতিবিদরা যখন ক্ষমতার বাইরে থাকেন তখন তারা এক রকম। আর ক্ষমতায় গেলেই তারা পরিবর্তন হয়ে যান।

তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস এলেও এখনো আমাদের হাত-পা পুরোপুরি খোলা নয়। গণমাধ্যম স্বাধীনতার সূচকে আমাদের অবস্থান ১৪৯-১৫২-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কেন পারছি না? সাংবাদিকতা কেন এ অবস্থায় এসেছে? এর মূল কারণ অনুগত সাংবাদিকতা। বিগত সরকারের সময় অনুগত সাংবাদিকতার পরিণতি আমরা দেখেছি। তাদের কেউ জেলে গেছেন, কেউ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, কেউ পলাতক, আবার কেউ চাকরি হারিয়েছেন।’

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাতসহ সব ক্ষেত্রে মজবুত কাঠামো দাঁড় করাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বড় সংবাদপত্রগুলো দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আজকের অবস্থানে এসেছে। যেমন নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের মতো পত্রিকাগুলো শত বছরের পুরনো। এসব প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি মিশ্র পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উন্নত বিশ্বে সংবাদপত্র পরিবারভিত্তিক ব্যবসা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠলেও তারা মান ধরে রাখতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই মান ধরে রাখা যায়নি।’

এনএসইউ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার বলেন, ‘দক্ষ ও নৈতিক সাংবাদিক তৈরি করার মাধ্যমে একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা জোরদারে ভূমিকা পালন করে। এসব পেশাজীবীকে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে এবং জনস্বার্থে কাজ করতে সক্ষম হতে হবে।’

উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আমাদের নাগরিক চর্চা শক্তিশালী করতে হবে এবং শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিনির্ধারণ ও গবেষণায় সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন।’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এনএসইউর স্কুল অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেসের ডিন অধ্যাপক রিজওয়ানুল ইসলাম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনএসইউর মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ার ড. এসএম রিজওয়ান উল আলম। তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য একটি জাতীয় সূচক প্রণয়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন।