মাঝ পর্যায়ে রয়েছে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। এবার আলোচনায় ঢাকার তৃতীয় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ পরিকল্পনা। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকার হেমায়েতপুর থেকে চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত প্রায় ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ‘ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৪৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। প্রকল্পের মোট খরচ হিসাবে নিলে উড়ালসড়কটি বাস্তবায়নে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ১ হাজার ১০৮ কোটি টাকা।
ঢাকার একটি হোটেলে গতকাল প্রকল্পটির ওপর এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞরা। সেতু কর্তৃপক্ষের করা সমীক্ষা অনুযায়ী, ‘ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ প্রকল্পের পূর্তকাজ বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ২২ হাজার কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন খাতে ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি (পূর্তকাজের অপ্রত্যাশিত ভৌত পরিবর্তন) খাতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আর প্রাইস কন্টিনজেন্সি বা মূল্যস্ফীতিজনিত ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে আরো ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ২০২৭ সালে শুরু হয়ে ২০৩০ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) পদ্ধতিতে উড়ালসড়কটি নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।
প্রকল্পের বিষয়ে সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্পটির পরিচালক কাজী মো. ফেরদাউস বলেন, ‘প্রস্তাবিত এক্সপ্রেসওয়েটি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর (সাভার) থেকে শুরু হয়ে আটিবাজার, আব্দুল্লাহপুর, ঝালপুরি বাজার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। প্রকল্পটি ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক (এন-৫), ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক (এন-৮) ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে (এন-১) যুক্ত করবে। এক্সপ্রেসওয়েটি বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদী অতিক্রম করবে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইনকেও সংযুক্ত করবে।’
সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক্সপ্রেসওয়েটি চালু হলে চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের পূর্বাঞ্চল এবং খুলনা ও বরিশালসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর যানবাহনগুলোকে আর ঢাকা শহরে বা হানিফ ফ্লাইওভারে ঢুকতে হবে না। গাড়িগুলো সরাসরি এ পথ ব্যবহার করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ২০টি জেলায় যাতায়াত করতে পারবে। এক্সপ্রেসওয়েটি এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ঢাকা ও আশপাশ এলাকার যানজট কমাতেও ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পটির সমীক্ষার তথ্য বলছে, ২০৩০ সালে এ এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে দিনে ২১-২৫ হাজার যানবাহন চলাচল করবে, যা ২০৫০ সাল নাগাদ ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ অংশে বর্তমানে যেখানে যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ২০-৩০ কিলোমিটার, এক্সপ্রেসওয়েটি চালু হলে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৯০ কিলোমিটারে।
গতকালের কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে আমাদের দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও অর্থ অপচয়ের অনেক অভিযোগ রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে আমাদের অনেক টাকার অপচয় হয়েছে। সময়মতো ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না করলে তা অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি আরো বলেন, ‘৫৩ বছরের অবকাঠামো নির্মাণের যে রাষ্ট্রীয় প্র্যাকটিস, সেটি থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। সেলফ কারেকশন এবং লক্ষ্য ঠিক না করে আমরা আগের সরকারের মতো ঢালাওভাবে মেগা প্রজেক্ট নিতে চাই না। আমরা এমনভাবে অর্থ ব্যয় করতে চাই, যাতে অর্থের অপচয় হবে না এবং জনগণ সুফল পাবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সেতু বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বলেন, ‘যানজটে জ্বালানি ও উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। এখন একটি আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবস্থা সময়ের দাবি। সেজন্য সরকার এ ব্যবস্থা নিয়েছে। এতে সময় বাঁচবে, যানবাহনের গতি বাড়বে। বিশেষ করে পণ্য পরিবহন ও আন্তঃনগর পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর্থিক বিশ্লেষণ বলছে, বাস্তবসম্মত টোল কাঠামো নির্মাণ করা গেলে প্রকল্পটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। আমরা প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপে (পিপিপি) প্রকল্প করতে চাই, যা মাইলফলক হবে।’
কর্মশালায় অন্যদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ। এতে সেতু বিভাগ ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি পিপিপি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে তৎকালীন অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ)। তার আগে প্রকল্পটির ওপর একটি সমীক্ষাও হয়। এতে ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন করা হয় ১৬ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। নতুন সমীক্ষায় এ ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এর কারণ জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক কাজী মো. ফেরদাউস বলেন, আগের সমীক্ষার প্রায় ১০ বছর পার হয়েছে। এ সময়ে ডলারের মান ও বাজারের পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে।










