নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দুই মাসের বেশি বন্ধ ছিল অভ্যন্তরীণ লঞ্চ চলাচল। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে গত ৩১ মে থেকে অন্য গণপরিবহনের সঙ্গে লঞ্চ চলাচলও শুরু হয়। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে কমসংখ্যক যাত্রী পরিবহনের নির্দেশনা ছিল। হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখাসহ করোনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে লঞ্চ চালু করতে বলা হয়েছিল মালিকদের। তবে চালুর নয়দিন পার হলেও স্বাস্থ্যবিধির ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। এরই মধ্যে ভাড়া বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছেন লঞ্চ মালিকরা। তবে করোনার এ সময়ে ভাড়া বাড়ানো হবে কিনা, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

এর আগে গত ২৯ মে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনায় বসেন লঞ্চ মালিকরা। ওই সভাতেই লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানান তারা। মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১০ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত দেয় বিআইডব্লিউটিএ। এ সময় স্বাস্থ্যবিধি ও নৌবিধি পালন যাত্রী পরিবহনের নির্দেশনা দেয়া হয়। আরো সিদ্ধান্ত হয়, সব নদীবন্দরে যাত্রীদের জন?্য জীবাণুমুক্ত ট?্যানেল বসাতে হবে। লঞ্চে যাত্রী পরিবহনের আগে থার্মোমিটারের মাধ?্যমে যাত্রীর শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে। যাত্রীদের লঞ্চে ওঠার আগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার, মাস্ক পরার মতো বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। মালিকরা যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও কমসংখ্যক যাত্রী তুলে পরিবহন সেবা দেন, তাহলে করোনা পরিস্থিতিতে ভাড়া বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয় বিআইডব্লিউটিএ।

ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে লঞ্চ মালিক সমিতির চেয়ারম্যান মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মানতে গিয়ে লঞ্চে যাত্রী কম তুলতে হচ্ছে। বিপরীতে পরিচালন ব্যয়ও এ সময় কিছুটা বেড়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে দেখা গেছে, ট্রিপ শেষে  লোকসান গুনছেন মালিকরা। এর আগে দুই মাসের বেশি লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকলেও ওই সময় কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়েছে। আর এখন লঞ্চ চালিয়ে যদি লোকসানে পড়তে হয়, তাহলে তো মালিকদের টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে যাবে। এসব বিষয় নিয়ে আমরা নৌ মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গে আমাদের আলাপ-আলোচনা চলছে। এখন দেখা যাক, সরকার আমাদের কী সিদ্ধান্ত দেয়। তবে ভাড়া বাড়ানো হবে নাকি হবে না, তা ঠিক হতে আরো দু’চারদিন সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।

এদিকে বিআইডব্লিউটিএর একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকার করোনার এ সময় লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর পক্ষে নয়। এটা ঠিক, দীর্ঘদিন ধরে লঞ্চের ভাড়া বাড়েনি। করোনা পরিস্থিতি হওয়ার আগে থেকেই মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এ সময় ভাড়া বাড়ালে জনমনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই করোনা পরিস্থিতি ঠিক হওয়ার পর লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোতে সম্মতি দেয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।

তবে যে স্বাস্থ্যবিধির কারণে যাত্রী পরিবহন হ্রাস পাওয়ার দোহাই দিয়ে লঞ্চ মালিকরা ভাড়া বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছেন, আদতে সেই স্বাস্থ্যবিধিই ঠিকঠাক মানা হচ্ছে না। গত নয়দিনে এমন বিস্তর অভিযোগ করেছেন যাত্রী ও ভুক্তভোগীরা। 

গতকাল ঢাকার সদরঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া সবকয়টি লঞ্চের ডেকে গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সদরঘাটে আসা লঞ্চগুলোতেও ছিল একই অবস্থা।

সবচেয়ে বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে যাত্রী ওঠানো ও নামানোর সময়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রী ওঠানামার জন্য লঞ্চ কর্তৃপক্ষ যেমন কোনো ব্যবস্থা রাখেনি, তেমনি বিষয়টি ভ্রুক্ষেপ করতে দেখা যায়নি যাত্রীদেরও। যে যার মতো পারছেন, উঠছেন ও নামছেন। যাত্রীদের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক থাকলেও অনেক যাত্রীকে মাস্ক খুলে রাখতে দেখা গেছে। যাত্রীদের হাত ধোয়ার জন্যও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখেননি লঞ্চ মালিকরা।

এসব অভিযোগ-বিশৃঙ্খলার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে লঞ্চ মালিক সমিতির মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের যেসব নির্দেশনা দিয়েছে, তা আমরা পুরোপুরি মেনে চলার চেষ্টা করছি। যেটুকু ব্যত্যয় ঘটছে, তার দায় যাত্রীদের।

সার্বিক বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বণিক বার্তাকে বলেন, মালিকরা লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের দাবির বিষয়টি আমলে নিয়ে আমরা একটা কারিগরি কমিটি গঠন করে দিয়েছি। এ কমিটি কাজ করছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ কমিটি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দেবে। ভাড়া বাড়ানো হবে নাকি হবে না, তা ঠিক করবে এ কমিটি।