সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুসম্পর্ক ছাড়া একটি গণতান্ত্রিক, শক্তিশালী ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম। তিনি বলেন, সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কে ফাটল থাকলে কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারে না।

মঙ্গলবার (৫ মে) জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং প্রতিরক্ষা সচিব উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বর্তমান সরকারের প্রতিরক্ষা নীতি, জাতীয় নিরাপত্তার বহুমুখী রূপ এবং অতীত সরকারের রেখে যাওয়া বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন।

ড. শামছুল ইসলাম বলেন, সশস্ত্র বাহিনী দেশের জনগণের বাহিনী। জাতির যেকোনো কঠিন সময়ে তা হোক ঘূর্ণিঝড়, বা অন্যকোনো দুর্যোগ—তারা জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক সমাধানের জন্য বেসামরিক প্রশাসনের ওপর আস্থা রেখে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন আর শুধু ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা প্রচলিত যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, সাইবার হামলা, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, তথ্যযুদ্ধ এবং অর্থনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার মতো বহুমাত্রিক হুমকি এখন আমাদের নিরাপত্তার অংশ।

তিনি জানান, সরকার সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের 'টোটাল পিপল ওয়ার' বা সর্বাত্মক জনযুদ্ধের ধারণাকে পুনরায় সক্রিয় করছে। এর অংশ হিসেবে খুব শিগগিরই বিএনসিসি ও আনসার-ভিডিপিকে সমন্বিত করে একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার রূপরেখা বাস্তবায়িত হবে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী 'ক্রেডিবল ডিটারেন্স' বা বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে।

বিগত ১৫ বছরে দেশের ওপর চাপিয়ে দেয়া কিছু পশ্চিমা বা বিদেশী পরিভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ডিসিদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘‌টেররিজম, এক্সট্রিমিজম বা র‍্যাডিকালিজমের’ মতো শব্দগুলো দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যায় না। বাংলাদেশ একটি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ। এখানে এক গ্রামে মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি অবস্থান করে। তাই শব্দগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে সাবধানতা অবলম্বনের অনুরোধ করছি।

সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের 'ইউনিফর্ম পরিহিত নাগরিক' আখ্যায়িত করে তাদের প্রতি বেসামরিক পরিমণ্ডলে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, সৈনিকরা সমাজের স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে কঠোর শৃঙ্খলার জীবন বেছে নেন। আপনারা আপনাদের অবস্থান থেকে তাদের প্রতি একটু সংবেদনশীল হলে, তাদের কাজগুলো নিয়মের মধ্যে থেকে একটু সহজ করে দিলে তারা সম্মানিত বোধ করবেন এবং এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই ইতিবাচক হবে।

বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসন এবং পরবর্তী দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া কৃত্রিম ক্ষতগুলোর কথা উল্লেখ করে ড. শামছুল ইসলাম বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার যেভাবে আমাদের বাহিনীগুলোকে ধ্বংস করেছে, আমরা তার উল্টো পথে হাঁটব। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতি বিরোধী 'জিরো টলারেন্স' নীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, যদি নিজের স্বার্থ, দুর্নীতি এবং অপকর্মের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন, তবে আপনারা আমাদের সহযাত্রী হতে পারবেন না। সবশেষে তিনি 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতি ধারণ করে একটি বিভাজনমুক্ত, ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।