৫ জুলাই শুরু হওয়া দুর্যোগ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম জোনের আওতাধীন অন্তত ৬৩টি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২১২ কিলোমিটার। বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস, সড়কধস, জলাবদ্ধতা ও সেতুর সংযোগ সড়ক ভেঙে যাওয়ায় জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি মেরামতের মাধ্যমে অধিকাংশ সড়কে চলাচল আংশিক বা পুরোপুরি স্বাভাবিক করা হয়েছে। তবু কয়েকটি স্থানে এখনো ঝুঁকি রয়ে গেছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের সড়ক ভবনে স্থাপিত বন্যা তথ্য কেন্দ্রের ১২ জুলাই পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি—এ ছয়টি সড়ক বিভাগের আওতায় ক্ষয়ক্ষতির এ হিসাব পাওয়া গেছে।
অনেক এলাকায় এখনো পানি পুরোপুরি না নামায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি। পানি নেমে গেলে বিস্তারিত পরিদর্শনের মাধ্যমে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি এবং স্থায়ী মেরামতের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে জনদুর্ভোগ কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে সতর্কতার সঙ্গে চলাচল এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প সড়ক ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছেন সওজের প্রকৌশলীরা।
বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের মোট ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক রয়েছে ৩৩ দশমিক ৯৮৫ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৩৪ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার এবং জেলা মহাসড়ক ১৪৩ দশমিক ৪৪৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই জেলা সড়ক, যেগুলোর ওপর স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল।
সড়ক বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ। সেখানে ৭৩ দশমিক ৮০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বান্দরবান, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের পরিমাণ ৫৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। চট্টগ্রাম বিভাগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫২ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার সড়ক। এছাড়া কক্সবাজারে ১৫ দশমিক ১৪ কিলোমিটার, খাগড়াছড়িতে ১১ দশমিক ৭২ কিলোমিটার এবং রাঙ্গামাটিতে ২ দশমিক ৬০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, ৮ জুলাই বেলা ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা এ পর্যবেক্ষণাগারের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাত। পরদিন ৯ জুলাই সকাল ৯টা পর্যন্ত আরো ২৭১ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। কয়েক দিনের এ টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। পাহাড়ি জেলাগুলোতে একাধিক স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে এবং বিভিন্ন সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। খাগড়াছড়ির জালিয়াপাড়া-সিন্দুকছড়ি-মহালছড়ি সড়কের পংখীমুড়া এলাকায় এবং বাঘাইহাট-মারিশ্যা সড়কের তিন কিলোমিটার এলাকায় পাহাড়ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। বান্দরবান-রোয়াংছড়ি-রুমা সড়কেরও কয়েকটি অংশ ধসে গিয়ে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ জাতীয় মহাসড়ক (এন-১), চট্টগ্রাম (অক্সিজেন)-হাটহাজারী-রাঙ্গামাটি জাতীয় মহাসড়ক (এন-১০৬), চট্টগ্রাম (মোহরা)-চন্দ্রঘোনা আঞ্চলিক সড়ক (আর-১৬৩) এবং রাঙ্গামাটি (ঘাগড়া)-চন্দ্রঘোনা-বাঙ্গালহালিয়া-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কের (আর-১৬১) বিভিন্ন অংশে পানি জমে যায়। কোথাও পাহাড়ধস, কোথাও আবার একটি সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক ধসে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়।
সওজ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্যোগের শুরু থেকেই প্রতিটি সড়ক বিভাগে জরুরি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দিন-রাত কাজ করছেন। পে-লোডারসহ ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে পাহাড়ধসে সড়কের ওপর জমে থাকা মাটি সরানো, বালিভর্তি বস্তা ও প্যালিসাইডিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ সুরক্ষিত করা এবং ইটের খোয়া ফেলে জরুরি মেরামতের কাজ চালানো হচ্ছে। বিভাগীয় ব্যবস্থায় মেরামতযোগ্য অংশগুলো দ্রুত সংস্কার করায় অধিকাংশ সড়কেই যান চলাচল পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সড়কগুলোতেও দ্রুত যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ চলছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, অনেক স্থানে এখনো পানি পুরোপুরি নামেনি। ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। পানি সরে গেলে বিস্তারিত পরিদর্শনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, কালভার্ট ও সেতুর পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং স্থায়ী মেরামতের ব্যয় নির্ধারণ করা হবে।
জানতে চাইলে সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন সড়ক বিভাগ থেকে আমরা ক্ষয়ক্ষতির একটা হিসাব পেয়েছি। অনেক সড়কে এখনো পানি থাকায় সেগুলোর তথ্য পেতে আরো সময় লাগবে। ক্ষতির তথ্য যৌথভাবে মূল্যায়ন করা হবে। মূল্যায়ন শেষে মেরামত কর্মসূচি অনুমোদন করা হবে। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো মেরামতের জন্য আমরা দরপত্র আহ্বান করব।’
তিনি আরো বলেন, ‘নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা সড়কগুলো যানচলাচল উপযোগী রেখেছি। বহু জায়গায় মেরামতের কাজ চলছে।’










