২০১৬ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের নির্মাণপর্বে দীর্ঘদিন তীব্র যানজট, ধুলাবালি, সড়ক সংকোচন ও খোঁড়াখুঁড়ির কারণে মিরপুরের বাসিন্দাদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল।

মেট্রোরেল চালুর পর সেই ভোগান্তির বড় একটি অংশ কমলেও মিরপুরবাসীর সড়ককেন্দ্রিক দুর্ভোগ যেন শেষ হচ্ছে না। মেট্রোরেল নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর শুরু হয়েছে একের পর এক সড়ক, ফুটপাত ও ড্রেনেজ উন্নয়নকাজ। এর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যুক্ত হয়েছে অন্যান্য সেবা সংস্থার প্রকল্প। ফলে একটি কাজ শেষ হওয়ার আগেই একই সড়ক বা ফুটপাতের আরেক অংশে শুরু হচ্ছে নতুন কাজ। এতে বারবার খোঁড়াখুঁড়ি, রাস্তা সংকুচিত হওয়া, ধুলাবালি, জলাবদ্ধতা ও যানজটের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ‘ইমপ্রুভমেন্ট অব ডিফারেন্ট ড্যামেজড রোড অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড সার্ভিস প্যাসেজ ডেভেলপমেন্ট’ (আইডিআরআইএসপি) প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর মিরপুরের বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে নতুন করে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়। ২০২৩ সালের প্রথমার্ধে টেন্ডার ও কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়। ডিএনসিসির অঞ্চল-২, ৪ ও ৫-এর বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে মিরপুর ও আশপাশের ওয়ার্ডগুলোতে সড়ক ও নর্দমা উন্নয়নের কাজ চলছে। চলতি বছরের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মেট্রোরেল নির্মাণের সময় সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি ও সংকুচিত রাস্তার ভোগান্তি পোহাতে হয় মিরপুরবাসীকে, মেট্রোরেল চালুর পরও তাদের সেই ভোগান্তি পুরোপুরি শেষ হয়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকাজের কারণে একই সড়কে বারবার পরিবর্তন আসছে।

এর একটি দৃশ্যমান উদাহরণ মিরপুর ১০ থেকে তালতলা পর্যন্ত রোকেয়া সরণি। চলতি বছরের মার্চে সড়ক ও নর্দমা উন্নয়নকাজ শুরুর কিছুদিন আগেই এ সড়কের ফুটপাতে রেলিং বসানোর কাজ করা হয়। কিন্তু এখন ডিএনসিসির আইডিআরআইএসপি প্রকল্পের আওতায় ফুটপাত ও ড্রেনেজ উন্নয়নকাজ করতে গিয়ে সেই রেলিং তুলে আবার বসানো হচ্ছে। অর্থাৎ একটি কাজ শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই নতুন প্রকল্পের প্রয়োজনে আগের কাজের অংশবিশেষ অপসারণ করতে হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিয়ে। কোনো সড়কে ফুটপাত নির্মাণ বা রেলিং স্থাপনের আগে সেখানে ড্রেনেজ কিংবা সড়ক সংস্কারের কাজ নির্ধারিত আছে কিনা, তা বিবেচনা করা হচ্ছে কিনা—এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, একই এলাকায় বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে কাজ করায় সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি নাগরিকদেরও বারবার একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

রোকেয়া সরণির দুই পাশে রয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শপিং মল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। প্রতিদিন মিরপুর ও আশপাশের এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ এ সড়ক ব্যবহার করে রাজধানীর বিভিন্ন অংশে যাতায়াত করে। শিক্ষার্থী, রোগী, স্বজন, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের নিয়মিত চলাচলের অন্যতম প্রধান পথ এটি।

এ পথে নিয়মিত অফিসে যাতায়াত করেন বেসরকারি চাকরিজীবী কাকন ঠাকুর। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেট্রোরেল নির্মাণের সময় আমরা কয়েক বছর এ রাস্তার ভোগান্তি সহ্য করেছি। মেট্রোরেল শেষ হওয়ার পর যখন পুরো রাস্তা ও ফুটপাত ঠিক করে দেয়া হলো, কয়েক মাসের মধ্যেই আবার সেই সুন্দর করে সাজানো ফুটপাত কেটে ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে। কিছুদিন আগে রাস্তার দুপাশের অলিগলি দীর্ঘদিন কেটে ফেলে রাখার পর এখন আবার ফুটপাত ও ড্রেনেজ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। কেন বারবার রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা কাটতে হবে, আর এর ভোগান্তি সাধারণ নাগরিকদেরই কেন পোহাতে হবে?’

তার প্রশ্ন, মেট্রোরেল নির্মাণের সময়ই কি পরবর্তী সড়ক, ড্রেনেজ ও ফুটপাতের কাজগুলো সমন্বয় করে করা যেত না?

বর্ষা মৌসুমে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ভোগান্তি আরো বাড়ছে। কোথাও কাদা ও পানি জমছে, কোথাও উঁচু-নিচু হয়ে আছে চলাচলের পথ। নির্মাণসামগ্রী ও কাজের জন্য সংকুচিত হয়ে পড়ছে সড়কের অংশবিশেষ। ফলে যানবাহনের পাশাপাশি পথচারীদেরও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। অফিসগামী যাত্রীদের যাওয়া-আসার সময়ে সবচেয়ে বেশি যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

মিরপুরবাসীর কাছে তাই উন্নয়ন এখন নিয়মিত ভোগান্তির আরেক নাম। মেট্রোরেল তাদের দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনের সুবিধা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মেট্রোরেল প্রকল্পের পর সড়ক, ফুটপাত, ড্রেনেজ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নকাজের ধারাবাহিকতা থামেনি। একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরপরই আরেকটি প্রকল্পের জন্য একই অবকাঠামোতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বারবার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সড়ক নীতিমালার সুস্পষ্ট নির্দেশনা যে আমাদের এই জুন থেকে সেপ্টেম্বর সময়টাতে যেন খনন না করা হয়। অথচ দেখা যাচ্ছে যে এই বর্ষা মৌসুমেও নগরবাসীর নিস্তার নেই। জনগণের তো ভোগান্তির শেষ নেই। এখানে মেট্রোরেলের কাজের কারণে দীর্ঘদিন এলাকাবাসী ভোগান্তির মধ্যে ছিল। এখন নতুন করে আবার এ ধরনের কাজ শুরু হওয়া কোনোভাবেই কাম্য না।’

সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখছেন তিনি, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি যে একই রাস্তায় বারবার খোঁড়াখুঁড়ি করা হচ্ছে। এটি আমাদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে এবং জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় করছে। অন্তত একটি রাস্তা খুঁড়লে যেন আগামী পাঁচ-সাত বছরের জন্য আর রাস্তা খোঁড়ার কারণ না থাকে, এমনভাবে সমন্বিত প্রকল্প নেয়া উচিত। সেবা সংস্থাগুলো কো-অর্ডিনেশনে (সমন্বয়) আসতে চায় না, কারণ তারা জানে কো-অর্ডিনেশনে এলে প্রকল্প কমে যাবে। তাদের টাকা পয়সা করার সুযোগও কমে যাবে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে থাকা ব্যক্তিরা অনেক সময় রাষ্ট্রের উন্নয়ন নয়, বরং প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনকে প্রাধান্য দেন।’

অর্থবছরের বাধ্যবাধকতা ও কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকার কথা উল্লেখ করে নগরবাসীকে আরো কিছুদিন ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানিয়েছেন ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বর্ষায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এবং উন্নয়নকাজের জন্য পথচারীদের বিশেষ সমস্যা হচ্ছে, এটা সত্য। তবে আমাদের অর্থবছর জুন-জুলাই, এটা মেনে নিয়েই কাজ করতে হয়। কাজও প্রায় শেষের দিকে। এলাকাবাসীকে বলব, আরেকটু ধৈর্য ধরুন, খুব দ্রুতই ভোগান্তির অবসান হবে।’