প্রায় ৮০ কর্মীর এ ডায়িং কারখানায় একসময় উৎপাদনের ব্যস্ততা ছিল স্বাভাবিক চিত্র। সাম্প্রতিক গ্যাস সংকট আর ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দিনের বড় একটি সময় কাপড় তৈরির যন্ত্রগুলো বন্ধ রাখতে হয়।
দীর্ঘদিনের ব্যবসায় নানা সংকটের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা। তাই কারখানাটিকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়ার কথা ভাবছে মালিক পক্ষ। হাবিব টেক্সটাইল মিলসের স্বত্বাধিকারীর ছেলে সেলিম আহমেদ, যিনি বর্তমানে কারখানাটির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি জানান, তারা এক-দেড় বছর কারখানাটি চালিয়ে দেখবেন। এর পরও কোনো উন্নতি না হলে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সেলিম আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরেই এ শিল্পের অবস্থা ভালো না। নানা সংকট নিয়ে টিকে আছি। ব্যবসায় মন্দা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আধুনিক যন্ত্রপাতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং ঋণের চাপ—সব মিলিয়েই ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে গত প্রায় দেড় মাসের গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। দিনের ছয় ভাগের এক ভাগ সময়ও কারখানা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অথচ উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন, কারখানার বিভিন্ন স্থায়ী ব্যয় ও ঋণের কিস্তি বন্ধ থাকে না।’
সেলিম আহমেদের কারখানার চিত্রটি এখন নরসিংদীর তাঁত ও ক্ষুদ্র শিল্প এলাকার অনেক উদ্যোক্তার বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাঁত ও বস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নরসিংদীর বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এখন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে গ্যাসের নিম্নচাপ ও অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহে। বিদ্যুৎ এলেও ভোল্টেজের ওঠানামার কারণে যন্ত্রপাতি চালানো নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তাঁত উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বিদ্যুৎনির্ভর তাঁতযন্ত্র একটানা চালানো না গেলে শুধু উৎপাদনের পরিমাণই কমে না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পণ্যের মানও। কাপড় বুননের মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে পুনরায় কাজ শুরু করতে সময় লাগে। এতে একই পরিমাণ কাঁচামাল ও শ্রম ব্যয় করেও আগের তুলনায় কম কাপড় উৎপাদন হচ্ছে।
গ্যাসনির্ভর ডায়িং ও অন্যান্য কারখানায় চাপ কম থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী যন্ত্র চালানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন সময়মতো শেষ করতে না পারায় সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। প্রভাব পড়ছে বিক্রি ও নগদ প্রবাহে। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি, কারখানা ভাড়া, ব্যাংক ঋণের সুদ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় একই থাকছে।
নরসিংদীর মাধবদীর মোসলেম ওয়েভিং নামের একটি পাওয়ারলুম কারখানায় কাজ করেন ৪০ জনের বেশি শ্রমিক। কারখানাটিতে উৎপাদিত কাপড় বিক্রি হয় মাধবদী বাজারে। কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তায় সেখানেও উৎপাদন তলানিতে নেমেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের প্রোপ্রাইটর মো. বিপ্লব মোল্লা।
তার অভিযোগ, লোডশেডিং এতটাই বেড়েছে যে অনেক সময় কারখানার দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজও ব্যাহত হচ্ছে। মোটর চালিয়ে শ্রমিকদের জন্য খাবার ও স্যানিটেশনের পানি সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে গরমের মধ্যে শ্রমিকদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।
বিপ্লব মোল্লা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের ভোগান্তি এখন চরমে। ঠিকমতো কোনোটা পাওয়া যায় না। শ্রমিকরা কাজ করতে পারে না, কারখানা চালাতে পারি না। কিন্তু আমাদের ব্যয় তো কমেনি। উৎপাদন কমলেও শ্রমিকের বেতন, কারখানা পরিচালনার খরচ—সবই দিতে হচ্ছে।’
নরসিংদীর তাঁত ও ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট শুধু কারখানার উৎপাদনেই প্রভাব ফেলছে না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ছে পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে। তাঁত ও ক্ষুদ্র শিল্পকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও কাঁচামাল সরবরাহকারীর জীবিকা গড়ে উঠেছে। ফলে কারখানার উৎপাদন কমে গেলে এর প্রভাব পড়ে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায়। সংকট দীর্ঘ হলে কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, এ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটি অংশ ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়ে কারখানা সম্প্রসারণ কিংবা যন্ত্রপাতি কিনেছে, তাদের চাপ তুলনামূলক বেশি। উৎপাদন ও বিক্রি স্বাভাবিক না হলে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।
মাধবদীর একটি তাঁতের কাপড় তৈরির প্রতিষ্ঠানের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানে নয়জন কর্মী রয়েছেন। কয়েক মাস ধরেই ব্যবসায় মন্দা ভাব চলছে। কর্মচারীর বেতন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল দিতেই হিমশিম খাচ্ছি। এর সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া ঋণের কিস্তি বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। এখন না পারছি কারখানা চালাতে, না পারছি বন্ধ করতে। আমাদের মতো একেবারে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে কারখানা এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
সব উদ্যোক্তা অবশ্য সংকটের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে পারেননি। ক্রমান্বয়ে লোকসান ও নানা সমস্যার মুখে কয়েক মাস আগেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে নরসিংদীর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান সোহেল ওয়েভিং ফ্যাক্টরি। কারখানাটির মালিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নানা কারণে ব্যবসায় টিকে থাকতে পারছিলাম না। বেশ কয়েক মাস হলো কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি। এখন অন্য কাজ করি। প্রতি মাসেই অনেকে কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে, আবার অনেকে নতুন করে চালুও করছে। এভাবেই আসলে তাঁত শিল্পটা চলছে।’
শুধু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটই নয়, উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে কাঁচামালের উচ্চ মূল্যও। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হলেও বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে সবসময় তা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ফলে কাপড়সহ অন্যান্য পণ্যের বাজারেও মন্দা ভাব তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
এর প্রভাব পড়ছে নরসিংদীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি কাপড়ের বাজার শেখেরচর বাবুরহাটেও। সেখানকার দোকানি সোহেল রানা জানান, আগের তুলনায় তার বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এখন ব্যবসা মূলত বছরে দুই-তিন মাসের উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে কিছুটা ভালো হয়, বাকি সময় মন্দা ভাবেই কাটে।
তিনি বলেন, ‘চলমান সংকটে কাপড়ের সরবরাহ কমেছে। আবার উৎপাদনের সময় গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক পণ্যের গুণগত মানও ঠিক থাকে না। এতে উৎপাদক ও দোকানি উভয়ের বিক্রি কমছে। পণ্যের মান খারাপ হলে পুরনো ক্রেতা হারানোরও ঝুঁকি থাকে। সব মিলিয়ে এখানকার তাঁত ও বস্ত্র শিল্প খুবই খারাপ সময় পার করছে।’
কারখানা মালিকদের অভিযোগ, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া কিংবা উৎপাদনের মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে অনেক সময় মেশিনে থাকা কাপড় ও অন্যান্য কাঁচামাল নষ্ট হয়ে যায়। এতে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র কারখানাগুলোও ক্ষতির মুখে পড়ছে। সীমিত পুঁজি নিয়ে পরিচালিত ছোট কারখানাগুলোর জন্য এ ধরনের অপচয় সামাল দেয়া আরো কঠিন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং মিলস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র এবং আবেদ টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডায়িং, প্রিন্টিং ও কাপড় প্রসেসিংয়ের সময় গ্যাস না পাওয়ায় নরসিংদীতে এক-দেড় কোটি গজ কাপড় নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় শত কোটি টাকা।’ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ নিয়েও নতুন সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নরসিংদীতে তাঁত ইউনিট রয়েছে ১ হাজার ১২৯টি। এসব ইউনিটে তাঁতের সংখ্যা ৪ হাজার ২৮১ এবং তাঁতি রয়েছেন ৫ হাজার ৯৩৫ জন। আর এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন তার কয়েক গুণ।
নরসিংদীর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটি অংশকে ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করছে বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণের কিস্তি পরিশোধের ধারা এখনো ইতিবাচক। কারণ তাদের লেনদেনের একটি বড় অংশ নগদে হয়। ফলে তাদের হাতে সবসময় কিছু নগদ অর্থ থাকে। সংকট তো মাত্র মাস খানেক শুরু হয়েছে। এ ধরনের সংকটের নেতিবাচক প্রভাব সাধারণত তিন-চার মাস পর ফুটে ওঠে। সংকট কেটে গেলে ঋণ নিয়ে সমস্যা হবে না। কিন্তু দীর্ঘ হলে সেটি উদ্যোক্তা ও ঋণদাতা উভয়ের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।’
নরসিংদীর তাঁত ও ক্ষুদ্র শিল্প এখন কেবল উৎপাদন সংকটের মুখে নয়; দাঁড়িয়ে আছে টিকে থাকার এক কঠিন পরীক্ষার সামনে। দিন শেষে ছোট উদ্যোক্তাদের সামনে দীর্ঘ হচ্ছে হিসাবের খাতা—কত টাকা বিক্রি হলো, কত টাকা বেতন দিতে হবে, কত টাকার কিস্তি বাকি আর কতদিন এভাবে কারখানা টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নরসিংদী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনজুর এলাহী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস সংকটটি জাতীয়। সরকার সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। উচ্চপর্যায় থেকে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। দ্রুতই সংকট কমে আসবে আশা করছি।’










