চলন্ত বাসে ডাকাতি ও শ্লীলতাহানির ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ তথ্যটি জানান। এর আগে শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে ঢাকার সাভারের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ।

শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে বাসের যাত্রী ওমর আলী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৮ থেকে ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। তারও তিনদিন আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী চলন্তবাসে ডাকাতি ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটে।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন— মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার লাউতারা গ্রামের বদর উদ্দিন শেখের ছেলে শহিদুল ইসলাম ওরফে মহিদুল মুহিত (২৯), শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের ইসমাইল মোল্লার ছেলে মো. সবুজ (৩০) ও ঢাকার সাভারের টান গেন্ডা এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে শরীফুজ্জামান ওরফে শরীফ (২৮)। এদের মধ্যে শহিদুল ইসলাম ওরফে মহিদুল মুহিতের বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানায় একটি ও ঢাকা জেলার সাভার মডেল থানায় একটি বাস ডাকাতি মামলাসহ মোট পাঁচটি মামলা রয়েছে।

পুলিশ সুপার জানান, চলন্তবাসে ডাকাতি ও শ্লীলতাহানির ঘটনায় সাভারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে জড়িত তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসময় তাদের কাছ থেকে তিনটি মোবাইল, একটি ছুরি ও ২৯ হাজার ৩৭০ টাকা উদ্ধার করা হয়। মামলা হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তথ্য প্রযুক্তি ও বিভিন্ন সোর্স ব্যবহার করে তাদেরকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। তাদেরকে পাঁচদিনের রিমাণ্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে।

tangail bus

তিনি আরো বলেন, ঘটনাটি বিভিন্ন জেলাব্যাপী বিস্তৃত থাকায় কার্যক্রম পরিচালনা চ্যালেঞ্জিং ছিল। তারপরও আমরা অপরাধীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। বাকি অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বাসে নারী যাত্রীদের ধর্ষণের শিকার হওয়ার বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তবে শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে। গ্রেফতারকৃতরা প্রাথমিকভাবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে।

এদিকে, মামলার এজলার সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে ইউনিক রোড রয়েলস্ পরিবহনের একটি (ময়মনসিংহ-ব-১১-০০৬১) বাস ঢাকার গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে রাজশাহীর নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। এসময় বাসটিতে ৩০ থেকে ৩৫ জন যাত্রী ছিল। পরে রাত ১২টার দিকে বাসটি হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে এবং হেমায়েতপুর থেকে আরো ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী নিয়ে বাসটি পুনরায় রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা করে। বাসটি গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানাধীন চন্দ্রা বাইপাসে পৌছালে চা-বিরতির জন্য থামে। সেখানে ১০ থেকে ১৫ মিনিট চা বিরতির সময় চন্দ্রা বাইপাস থেকে আরো তিন থেকে চার জন নতুন যাত্রী নিয়ে রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা করে বাসটি। রাত দেড়টার দিকে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানাধীন হাইটেক সিটি পার্ক সংলগ্ন খাড়াজোড়া ফ্লাইওভার ব্রিজ অতিক্রম করার ৫ থেকে ৬ মিনিট পর হঠাৎ ৮ থেকে ৯ জন যাত্রীবেশে ডাকাত এক সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায় এবং ধারালো চাকু ও চাপাতি দেখিয়ে যাত্রীদের জিম্মি করে ফেলে।

এসময় তাদের মধ্যে তিনজন অজ্ঞাতনামা ডাকাত বাসচালকের গলায় ধারালো চাকু ধরে টানাহেঁচড়া ও কিলঘুষি মেরে তাকে চালকের আসন থেকে উঠিয়ে দেয়। ডাকাতদের মধ্য থেকে একজন চালকের আসনে বসে বাসটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং বাসটি চালিয়ে টাঙ্গাইলের দিকে রওনা হয়। পরে মির্জাপুর উপজেলার সোহাগপাড়া সাকিনস্থ ফুটওভার ব্রিজের কাছে পৌঁছালে ডাকাতদলের সদস্যরা লুণ্ঠন শুরু করে।

এসময় যাত্রীদের কাছে থাকা টাকা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার ও রূপাসহ সকল মালামাল ছিনিয়ে নেয়। পরে তারা গাড়িটি দেলদুয়ার উপজেলার নাটিয়াপাড়ায় গিয়ে ইউটার্ন নিয়ে ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু করে। এভাবেই প্রায় তিন ঘণ্টা যাত্রীদের মালামাল লুণ্ঠন ও নারীদের শ্লীলতাহানির পর আশুলিয়ার নন্দন পার্ক এলাকায় নেমে যায়। পরবর্তীতে চালক গাড়ি নিয়ে চন্দ্রা মোড়ে গেলে গাড়িতে থাকা যাত্রীরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে ঘটনার বিষয়ে পুলিশকে জানালে কিছুক্ষণের মধ্যে টহল পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়। টহল পুলিশ মির্জাপুর থানায় বিষয়টি অবগত করার পরামর্শ দেন। মির্জাপুর থানায় সেবা না পেয়ে তারা নাটোরের বড়াইগ্রাম থানায় গিয়ে অবগত করেন। বিষয়টি ওই এলাকায় সংগঠিত না হওয়ায় পুলিশ চালক, বাসের সুপারভাইজার ও সহকারীকে আটক করে ৫৪ ধারায় আদালতে প্রেরণ করে। পরে তারা ওইদিনই জামিনে মুক্তি পান।