জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। এতে কমেছে উৎপাদন। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পেরে বায়ার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি শহর ও গ্রামের জনজীবনও এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শিল্প মালিকদের কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে কমেছে দিনমজুর শ্রমিকদের আয়। দ্রুত টেকসই সমাধান না মিললে সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া এলএনজি টার্মিনালের সমস্যার কারণে নোয়াখালীতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন জেলার গ্রাহকরা।

কুমিল্লা বিসিক শিল্পনগরীসহ চৌদ্দগ্রাম, ময়নামতি ও বুড়িচংয়ের শিল্পাঞ্চলে দৈনিক আট থেকে ১০ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে। এতে দিনে গড়ে ৪-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে কারখানাগুলো। ফলে পোশাক, প্লাস্টিক, অটো রাইস মিল, রি-মেল্টিং স্টিল মিল ও হালকা প্রকৌশল শিল্পে উৎপাদনে ধস নেমেছে। বিদ্যুৎ যাওয়ায় নষ্ট হচ্ছে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি।

শফিউল আলম স্টিল মিলসের ম্যানেজার প্রণব দাস জানান, দিনে আট থেকে ১০ বার বিদ্যুৎ যায়। উৎপাদন চালু রাখতে জেনারেটর চালাতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, ‘কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক অর্থনীতি বাঁচাতে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নিতে হবে।’

কুমিল্লা বিসিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. মুনতাসীর মামুন জানান, ১৪৬টি উৎপাদনমুখী কারখানা রয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে খাদ্য উৎপাদনশীল বেকারিগুলো রান করতে পারছে না। মালিকরা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়ছেন।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কুমিল্লা জোনের সহকারী প্রকৌশলী মো. এনায়েত হোসেন গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ জোনের অধীন ছয় জেলায় (কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী) জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের সাময়িক সরবরাহে পিডিবির ৬০ মেগাওয়াট ও আরইবির ৩০০ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে। চাহিদার তুলনায় ঘাটতির কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’

এদিকে নরসিংদীর শত শত টেক্সটাইল ও ডাইং মিল গ্যাসের অভাবে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। সিএনজি পাম্পগুলোতে গ্যাসের প্রেশার ১২-১৫ পিএসআই থাকার কথা থাকলেও মিলছে মাত্র শূন্য থেকে ২ পিএসআই। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নষ্ট হচ্ছে চালকদের কর্মঘণ্টা। সড়কসংলগ্ন অধিকাংশ বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না। জ্বালানি সংকটের এ আগুনে ঘি ঢালছে বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং। শহরের মানুষ ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পেলেও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ মিলছে মাত্র ৫-৬ ঘণ্টা।

নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রাশেদুল হাসান রিন্টু (সিআইপি) বণিক বার্তাকে বলেন,"‘গ্যাসের তীব্র সংকটে কারখানার চাকা অচল। এর ওপর মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে বিকল্প জেনারেটর চালাতে জ্বালানি তেলের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। মালিকরা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনছেন। কারখানা বন্ধ হলে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারাবেন। সময়মতো কাপড় সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজার হাতছাড়া হবে।’

গৃহিণী আনিকা খানম জানান, এক সপ্তাহ ধরে ফ্ল্যাটে গ্যাস নেই। রান্না বন্ধ থাকায় বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।

নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ দিয়ে চালানোর জন্য বিদ্যুতের সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বড় প্রায় সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানই এখন বিদ্যুৎ দিয়ে চালাচ্ছে। এতে রাতারাতি বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেছে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়েনি।’

নরসিংদী তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুনুর রহমান বলেন, ‘‌জেলায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এর মধ্যে ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সিএনজি স্টেশন, কলকারখানা ও বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি মেরামত হলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিসিকের ৬৮ কারখানার মধ্যে চলমান ৬০টিতে লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে। তবে বেশির ভাগ মেশিন গ্যাসচালিত হওয়ায় বড় বিপর্যয় না ঘটলেও ডেলিভারিতে বিঘ্ন ঘটছে। এতে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বায়ার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। খলিল বশির ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ম্যানেজার (প্রশাসন) মোহাম্মদ গোলাম সাদেক জানান, পিডিবি সহযোগিতা করলেও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন কিছুটা কমছে।

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের ওপরও। মোহাম্মদ সোহেল রানা নামে এক শ্রমিক বলেন, ‘আগে দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করতাম। এখন ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ থাকে না। ফলে আয় কমে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিসিকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) রোকন উদ্দিন বলেন, ‘কারখানা চলার সময়ে বিদ্যুৎ চলে গেলে মেশিনগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে ব্যাঘাতের সৃষ্টি হয়। উৎপাদনেও প্রভাব পড়ে, তবে বড় ঘাটতি হয় না। কারণ আমাদের কারখানাগুলোর বেশির ভাগ গ্যাস দ্বারা পরিচালিত হয়।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (ডিস্ট্রিবিউশন ঘাটুরা) নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘নির্ধারিত নীতিনির্ধারণী অনুযায়ী আমরা ডিস্ট্রিবিউশন করে যাচ্ছি। এতে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটলেও আমরা যথেষ্ট সচেতন আছি।’

এদিকে এলএনজি টার্মিনালের সমস্যার কারণে নোয়াখালী পৌরসভা এলাকায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছেন শহরের প্রায় ২৯ হাজার ৩৫০ গ্রাহক। বন্ধ রয়েছে সাতটি সিএনজি স্টেশন। গতকাল দুপুর ১২টা থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বাখরাবাদ নোয়াখালীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ব্যবস্থাপক নূর করিম। কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে তা নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

নোয়াখালী পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা তানিয়া আক্তার জানান, সকালে ছেলেমেয়েদের জন্য নাশতা রেডি করা হলেও দুপুর ১২টার দিকে রান্না বসাতে গিয়ে দেখেন গ্যাস নেই।