চলতি বছর এ হিস্যা আরো বাড়ার কথা থাকলেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ, মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং কাতারের এলএনজি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ প্রায় বন্ধ। এতে কাতারের এলএনজির ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে কাতারের সরকার ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকও করেছে বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে কাতার। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, হরমুজ সংকট না কাটা পর্যন্ত দেশটি থেকে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিষয়টি কেবল কাতারের সহযোগিতার আগ্রহের ওপর নির্ভর করছে না; বরং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল, ইরানের অনুমতি এবং মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের ওপর নির্ভরশীল।
তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল শিগগিরই স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিরসনে কূটনৈতিক আলোচনা কার্যত স্থবির। একই সঙ্গে মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে ইরানও প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজগুলোর এ পথে চলাচল কার্যত বন্ধ। স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আবার কবে শুরু হবে সেটা অনিশ্চিত। ফলে কাতার থেকে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার ক্ষেত্রেও আপাতত আশার আলো দেখা যাচ্ছে না।
কাতার থেকে এলএনজি আমদানিতে বাংলাদেশের দুটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। এর একটি কাতার এনার্জির সঙ্গে এবং অন্যটি কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসির সঙ্গে। চুক্তি দুটির আওতায় চলতি বছর মোট ৫২ কার্গো এলএনজি আসার কথা ছিল। এর মধ্যে কাতার এনার্জির ৪০টি এবং কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসির ১২টি কার্গো। তবে মার্চে সংঘাত শুরুর পর থেকে এসব চুক্তির আওতায় দেশে এসেছে ১২টি কার্গো। এগুলোও সরাসরি কাতার থেকে নয়, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের এলএনজি স্থাপনা, বিশেষ করে রাস লাফান শিল্পনগরী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক দফায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে থাকা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহে ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণা করে কাতার। সর্বশেষ গত ২৪ জুলাই দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জন্য এলএনজি সরবরাহে ঘোষিত ফোর্স মেজারের মেয়াদ বাড়ায় কাতার এনার্জি। রয়টার্সের এক খবরে বলা হয়, যেসব নোটিসের মেয়াদ আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো এখন সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ফোর্স মেজারের মেয়াদ আরো বাড়ানো হতে পারে।
ফোর্স মেজারের কারণে গ্যাস সংকটে থাকা বাংলাদেশেও দেশটি থেকে সরাসরি এলএনজি কার্গো আসা বন্ধ হয়ে যায়। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি আগস্টেও কাতার থেকে সরাসরি কোনো এলএনজি কার্গো দেশে আসেনি।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার দুই কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, বাংলাদেশের গ্যাস সংকট মোকাবেলায় সহযোগিতা দিতে চায় কাতার। তবে এলএনজি সরবরাহ নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা, ইরানের অনুমতি, মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং মিত্রদেশগুলোর অবস্থানসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর। বিশেষ করে কাতারের এলএনজি কার্গো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় কোনো বাধা বা হামলার মুখে পড়বে না—ইরানের কাছ থেকে এমন নিশ্চয়তা চায় দেশটি। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় চলতি বছর বাংলাদেশকে ১৭ কার্গো এলএনজি সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে কাতার। তবে এসব কার্গো কখন ও কীভাবে সরবরাহ করা হবে এবং সেগুলো সরাসরি কাতার থেকে নাকি তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে আসবে—সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কিছু জানায়নি দেশটি।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবেলায় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে কাতার সরকার। ১৯ আগস্ট কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানির সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বৈঠকে এ আশ্বাস দেয়া হয়। দুইদিনের এ সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সফরকালে জ্বালানি ও অর্থ খাতে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতা এগিয়ে নিতে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠনে সম্মত হয় বাংলাদেশ ও কাতার।
জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে কাতার এনার্জির সদর দপ্তরে দেশটির জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবিরের সঙ্গেও বৈঠক করেন খলিলুর রহমান। বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে দেশে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তবে বৈঠকের পর কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া বিবৃতিতে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার কথা জানানো হলেও জ্বালানি সহযোগিতা বা এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
বাংলাদেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলার মধ্যেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ দুইদিনের সফর অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে এলএনজি টার্মিনাল-সংক্রান্ত জটিলতায় তিন সপ্তাহ ধরে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তবে এরই মধ্যে দুটি টার্মিনাল দিয়ে গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সামগ্রিক সংকট এখনো কাটেনি। এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কাতার থেকে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ায় দেশের জ্বালানি খাত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্প-কারখানা, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক খাতেও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের কাছে গ্যাস খাতে সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। তবে পর্যাপ্ত জ্বালানি অবকাঠামো না থাকায় এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সংকট নিরসনের সুযোগ সীমিত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের স্বাভাবিক ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহও স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ বিষয়ে আশাব্যঞ্জক কোনো অগ্রগতিও দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না এবং নতুন করে আলোচনার সময়সূচিও নির্ধারিত হয়নি। একই সঙ্গে মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল রয়েছে। ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগও নিয়েছে ওয়াশিংটন। এর মধ্যেই ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিকে বর্তমানে ‘আমেরিকান ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখছেন বলেও মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে ইরান। দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডের তৎপরতা, ড্রোনের নজরদারি, রেডিও বার্তার মাধ্যমে জাহাজকে সতর্ক করা এবং সামুদ্রিক মাইনের ঝুঁকির কারণে এ পথে চলাচল এখনো বিপজ্জনক। বিশেষ করে ওমানের দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থার হিসাবে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ শুরুর পর থেকে গত শুক্রবার পর্যন্ত সেখানে অন্তত ৬৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৯ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। তবে গত কয়েক দিনে ইরান কয়েকটি ইরাকি তেলবাহী জাহাজকে প্রণালি অতিক্রমের বিশেষ অনুমতি দিয়েছে। এ অনুমতি অবশ্য সব দেশের জাহাজের জন্য প্রযোজ্য নয়। উপসাগরীয় কয়েকটি দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করছে তেহরান, যার মধ্যে কাতারও রয়েছে। ফলে কাতারের এলএনজিবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাওয়া এখনো অনিশ্চিত। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন জাহাজ চলাচল নিশ্চিত না হলে কাতারের এলএনজি রফতানি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।










