ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির ক্ষমতা গ্রহণের ১৮০ দিন এরই মধ্যে পেরিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি খাতে ৩১ সূচকের ১৯টিতেই অবনতি ঘটেছে। বাকি ১২টি সূচকে উন্নতি ঘটলেও অর্থনীতি নিয়ে খুব আশাব্যঞ্জক কিছু দেখা যায়নি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মূল্যায়ণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

রোববার (২৩ আগস্ট) সিপিডির কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

বিএনপি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর এ পর্যন্ত বাস্তবায়িত বা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপসমূহ সিপিডির মূল্যায়ণে বিবেচনা করা হয়েছে। যে সব উদ্যোগ, প্রতিশ্রুতি, নীতিগত ঘোষণা বা পরিকল্পনা এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি, সেগুলোকে বিবেচনার আওতায় আনা হয়নি। বিষয়গুলোকে মোট ৯টি খাতে ভাগ করে ৩৬২টি পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। এরমধ্যে সুশাসন, বিচার ও জনপ্রশাসনের ১০৫টি পর্যবেক্ষণ এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ২৫টি পর্যবেক্ষণ মূল্যায়ণ করা হয়েছে।

এছাড়া শিল্প ও বাণিজ্য খাতে (৪৫), ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত (১৫), জ্বালানি ও পরিবহন (৫২), কৃষি ও গ্রামীণ অকৃষি খাত (২২), শিক্ষা খাত (৪৯), স্বাস্থ্য (২৬) এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে (২২) পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এসব পর্যবেক্ষণে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় ধরনের মূল্যায়ণ তুলে ধরেছে সিপিডি।

সংস্থাটি বলছে, সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট বরাদ্দ না নেয়া, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা (রামিসা হত্যা ও মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলা), ২৮ জেলায় ই-জামিন বন্ড ও ই-ফ্যামিলি কোর্ট চালুকরণ, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) চুক্তি স্বাক্ষর, ‘বাংলাবিজ’ চালু, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, নারীদের জন্য ‘পিঙ্ক বাস’, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ট্রেন ও মেট্রোরেলে ২৫ শতাংশ ছাড় এবং নারীদের স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকূফের সিদ্ধান্তগুলো ইতিবাচক।

এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়, বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়োগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে আকস্মিক অপসারণ ও নতুন নিয়োগে স্বার্থের দ্বন্দ্বের অভিযোগ, মব জাস্টিস, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওপর অব্যাহত হামলা, গ্যাস সংকটে ৫টি ইউরিয়া সার কারখানার ৪টিই বন্ধ থাকা এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়গুলোকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে সিপিডি।

তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ণ করতে গিয়ে খুব বেশি আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি দেখা যায়নি সিপিডির মূল্যায়ণে। সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, মুদ্রানীতি ও মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক খাত, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ—এ ছয়টি খাতের ৩১টি সূচক বিবেচনায় নিয়েছে সিপিডি। এরমধ্যে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা, নিম্নমুখী বিদেশি বিনিয়োগ, মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য, বৈদেশিক আয় ও কর্মসংস্থান কমে আসা, শিল্পোৎপাদন প্রবৃদ্ধি শূণ্যে নেমে আসাসহ ১৯টি সূচকেই অবনতি হয়েছে।

বিপরীতে, করবহির্ভূত রাজস্ব আয়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ও মূল্যস্ফীতির মতো ১২টি সূচকে গত ছয় মাসে উন্নতি দেখা গেছে। যদিও এরমধ্যে মূল্যস্ফীতি আসল পরিস্থিতি বুঝতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে বলে মনে করে সিপিডি।

এছাড়া বিগত সরকারের মতো পরিসংখ্যান নিয়ে কোনো লুকোচুরি করা হবে না বলেও বর্তমান সরকার নানা বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য প্রদানে বিরত থাকছে বলে দাবি করা হয়েছে সিপিডির পক্ষ থেকে।

সিপিডি বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক সরাসরি চাকরি হারিয়েছেন।

সংস্থাটি বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের যে লক্ষ্য ধরেছে, তা অর্জনে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। অথচ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বার্ষিক রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

২০১০-১১ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধিও যদি অর্জন করা যায়, তবুও চলতি অর্থবছরে ৭০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি থাকবে। ২০০০-২০০১ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ করে। এ হিসাব ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত টেনে নিলে গড় প্রবৃদ্ধি আরো কমে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসে। সে হিসাবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি থেকে যাবে বলে ধারণা করছে সিপিডি।

অনিবার্য এ বাজেট ঘাটতির কারণে সরকার এডিপিতে কাটছাঁট করলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতকে যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করা না হয়, সে আহ্বান জানিয়েছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

দেবপ্রিয় বলেন, ক্ষমতা গ্রহণের সময় সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে এক ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, দায়িত্ব নেয়ার সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে সরকার একটি সমন্বিত দলিল তৈরি করল না। এ কারণে এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

উদ্ভূত অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় ৫টি সুপারিশ করেছে সিপিডি। এগুলো হলো অক্টোবর ২০২৬-জুন ২০২৭ মেয়াদের জন্য বাস্তব উপাত্তভিত্তিক একটি ‘কোর বাজেট’ প্রণয়ন করা; কোর বাজেটের লক্ষ্যগুলোকে পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত পরিকল্পনার (জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১) সঙ্গে সমন্বয় করা; এনবিআরের সংস্কার, ব্যাংক পুনর্গঠন, গ্যাস ও জ্বালানি অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা এবং পে-স্কেল কমিশনের কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করা; প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা দূর করে কার্যকর আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে অর্থমন্ত্রী কর্তৃক সংসদে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতের সংস্কার পরিকল্পনা পেশ করা।