তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশই থাকবেন নারী এবং তারা ঘরে ঘরে গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াবেন বলেও জানান তিনি। সিলেট সিটি করপোরেশন আয়োজিত গতকাল সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সরকারপ্রধান এ কথা জানান।

সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় সুরমা নদীর উভয় তীরে সৌন্দর্যবর্ধনসহ বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে সুধী সমাবেশটির আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপি সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য শহরের মানুষ কিছুটা চিকিৎসাসেবা পেলেও গ্রামের মানুষকে আমরা চিকিৎসা সুবিধা দিতে পারিনি। সেজন্য আমরা বলেছিলাম, আমরা একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চাই। আমরা যদি মানুষকে সচেতন করতে পারি, সচেতনতার মাধ্যমে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারি, তাহলে অসুস্থতার হার কমে আসবে। তার পরও যারা অসুস্থ হবে, তারা বেটার চিকিৎসা পাবে।’

এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের দায়িত্ব হলো গ্রামে গ্রামে মানুষের ঘরে যাওয়া। শহরেও তারা থাকবেন, মানুষকে সচেতন করবেন। আমরা বেশি জোর দেব গ্রামের মানুষদের। তারা গ্রামে গিয়ে মানুষকে বোঝাবেন কোন খাবার খেলে ডায়াবেটিস হবে, কোন খাবার খেলে হার্টে সমস্যা হবে না, সেসব বিষয়ে সচেতন করবেন, হাইজিন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করবেন। এতে অসুস্থ রোগীর সংখ্যা কমে আসবে।’

নদীদূষণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বুড়িগঙ্গার পানি এরই মধ্যে বিষাক্ত হয়ে গেছে। অন্যান্য নদীর ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি হলে তা ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে। এজন্য প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে শিক্ষা দিলে তারা পরিবারেও সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারবে।’

সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি বক্তব্যে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সমস্যার বিষয়টি উত্থাপন করে তা সমাধানে সরকার কাজ করছে বলেও তিনি জানান।

সিলেট নগরীর জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানে খাল খননকে প্রধান উপায় হিসেবে গুরুত্ব দেয়ার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘সিলেটে অল্প বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। অতিবৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন হাওর এলাকায় বিশেষ করে সুনামগঞ্জসহ অন্যান্য জেলায় বন্যায় কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমানে নগরের পানির বড় অংশই ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে, যার ফলে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি শুধু সিলেটে নয়, ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরেও দেখা যাচ্ছে।’ সুপেয় পানির চাহিদা পূরণের আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার লেভেল যেটা আছে, সেটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে। এ সবকিছু বিষয় মাথার মধ্যে রেখে বিবেচনা করে আমরা খাল খনন কর্মসূচি সারা দেশে দিয়েছি। আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার লেভেল যেটা আছে, সেটা শুধু সিলেট সিটি করপোরেশন নয়, এ সমস্যা ঢাকায় আছে, এ সমস্যা অন্য অনেক শহরে আছে। আমাদের জন্য যেটি একটি বড় সমস্যা হচ্ছে। যেভাবে আমরা মাটির নিচে যে পানি আছে, এটিকে যে টেনে তুলছি, এছাড়া কৃষিকাজের জন্য একই কাজ আমরা করছি, এটি ধীরে ধীরে একটি ভয়াবহ অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।’

সড়ক যোগাযোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনের সময় যখন সিলেটে এসেছিলাম, তখন বলেছিলাম—সিলেট থেকে লন্ডন যেতে ৯ ঘণ্টা বা সাড়ে ৯ ঘণ্টা লাগে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অবস্থা এতই খারাপ যে মনে হয় ১০ ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়। সেদিন বলেছিলাম—আমরা সরকার গঠন করার পর এ কাজটিতে হাত দেব। সরকার গঠনের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসেছি। তারা জানাল, ১১টি জায়গায় প্রশাসনিক জটিলতাসহ নানা কারণে কাজটি বন্ধ রয়েছে। রাস্তাটির সব জটিলতা শেষে কাজটি শুরু হতে সময় লাগবে। কয়েক বছরের মধ্যে আমরা এটা শেষ করতে পারব, আর কাজটি হয়ে গেলে মানুষের যাতায়াতে এত কষ্ট ভোগ করতে হবে না।’

সড়কের পাশাপাশি রেল যোগাযোগ উন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডাবল লাইন স্থাপনসহ রেল ব্যবস্থা উন্নত করা হলে খরচ কমবে এবং সময় সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে কৃষিজমি রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। সারা দেশের বন্ধ সব কলকারখানা চালু করা হবে। সে জন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সিলেটে একটি আইটি পার্ক করা হয়েছে, যেটি সচল নেই। এটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, খুব দ্রুতই এটি চালু করা হবে। যেখানে আমাদের তরুণরা ফ্রিল্যান্সিং করতে পারে, আইটির কাজ করতে পারে। যারা কাজ করতে পারছে আর যারা পারছে না, তাদের এখানে সুযোগ করে দেয়া হবে। আমরা আইটি সেক্টরে এ কাজ করছি। বিভিন্ন জায়গায় আমরা ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলো আপডেট করতে, মডারেট করতে, যাতে মানুষ যারা আছে, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী তারা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে।’

সুধী সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন বস্ত্র, পাট ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার প্রমুখ।

এর আগে নগরীর ক্বিন ব্রিজ এলাকায় বিভাগীয় নগরী সিলেটকে বন্যামুক্ত রাখতে সুরমা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ছড়া-নালায় স্লুইসগেট ও নদীর দুই তীরের ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে ইউএস-বাংলার বিএস-৫৩১ ফ্লাইটে তিনি সিলেটে পৌঁছান। পরে হযরত শাহজালালের (রহ.) মাজার জিয়ারত করেন। সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ও সিলেটের কন্যা ডা. জুবাইদা রহমান।