গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন বাংলাদেশের (জিএসকে) ব্যবসা কিনে নিচ্ছে ইউনিলিভার। চলছে মালিকানা বদলের প্রক্রিয়া। অধিগ্রহণের এ সময় এসে চাকরি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন জিএসকের বিভিন্ন বিভাগের শতাধিক কর্মী। ছাঁটাই আতঙ্কে রয়েছেন তাদের অনেকেই। অনেকেই ইউনিলিভারের সঙ্গে থাকতেও চান। আবার অনেকেই আছেন, যারা জিএসকে বা ইউনিলিভার কারো সঙ্গেই থাকতে চাইছেন না। তাদের শঙ্কা, ইউনিলিভারের মালিকানায় গেলে জিএসকের পণ্যগুলোর ব্যবসা কমে যাবে। তবে তাদের প্রত্যেকেরই অভিযোগ, মালিকানা বদলের বিষয়টি নিয়ে তাদের পুরোপুরি অন্ধকারে রেখেছে জিএসকে।

নতুন কোম্পানিতে কর্মীদের অবস্থান কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। চাকরিতে থেকে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের সঙ্গে এখনো এ-সংক্রান্ত কোনো ‘রিটেনশন এগ্রিমেন্ট’ সই হয়নি। ঠিক হয়নি কর্মীদের চাকরি থেকে অব্যাহতি নেয়ার পদ্ধতিও। বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই অনেককে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগও উঠছে।

জিএসএকের একটি সূত্র বণিক বার্তাকে জানিয়েছে, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে শেয়ারবাজার এখন বন্ধ। ফলে ইউনিলিভারের সঙ্গে একীভূতকরণের প্রক্রিয়াটিও এখন থমকে গিয়েছে। বাজার চালু হলে ১৫-২০ দিনের মধ্যেই এ অধিগ্রহণ সম্পন্ন হবে। অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার দ্বারপ্রান্তে থাকলেও কর্মীরা আছেন চরম অনিশ্চয়তায়। অধিগ্রহণের পর ইউনিলিভারে তাদের চাকরি থাকবে কিনা, এটা নিয়ে তারা যেমন অনিশ্চয়তায় আছেন, তেমনি অনিশ্চয়তায় আছেন চাকরি ছেড়ে দেয়া নিয়েও। কেউ নতুন মালিকানায় চাকরি করতে না চাইলে চাকরি ছাড়ার প্রক্রিয়াটি কেমন হবে, সে বিষয়টিও খোলাসা করেনি বর্তমান নিয়োগকর্তা প্রতিষ্ঠান জিএসকে। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক ১৫০ জনের মতো কর্মী রয়েছেন।

লিগ্যাল নোটিসে উল্লেখ করা হয়, জিএসকে ও ইউনিলিভার ভিন্নধর্মী দুটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান দুটির উৎপাদিত পণ্য ও ভোক্তাশ্রেণীও ভিন্ন। ইউনিলিভারের মালিকানায় গিয়ে জিএসকের কর্মীদের নতুন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হবে। জিএসকের অনেক কর্মী এ চ্যালেঞ্জ নিয়ে চাকরি অব্যাহত রাখতে পারেন। আবার অনেকেই চাকরি ছেড়ে চলে যেতে পারেন। এক্ষেত্রে কর্মীদের জন্য কী সুযোগ রাখা হচ্ছে—সেটা জানার অধিকার যেমন কর্মীদের আছে, তেমনি এটা জানানোর দায়িত্বও নিয়োগকর্তারও।

নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের অধিগ্রহণের পর কখনো কখনো ক্রেতা প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই, বেতন কমিয়ে দেয়া, বোনাস কমিয়ে দেয়া, পদোন্নতি বন্ধ করে দেয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এ ধরনের পদক্ষেপ কর্মীদের জন্য ভীতিকর ও অস্বস্তিকর কর্মপরিবেশ তৈরি করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এরই মধ্যে একাধিক কর্মীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে জিএসকে। কর্মীরা বলছেন, অব্যাহতি নয়, তাদের আসলে ছাঁটাই করেছে জিএসকে কর্তৃপক্ষ।

সূত্রটি বলছে, ব্যবসা বিক্রির খবরে এরই মধ্যে বছরের প্রথম প্রান্তিকে জিএসকের মুনাফা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। এতে করে কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। পেশাগত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকেই এরই মধ্যে জিএসকে থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। অনেকেই অব্যাহতি নেয়ার পরিকল্পনা করছেন।

ওই সূত্র আরো জানায়, কনজ্যুমার হেলথকেয়ারের সব ব্যবসা ইউনিলিভারের কাছে বিক্রি করলেও সেনসোডাইন ও ইনো নিজেদের মধ্যে রেখে দেবে জিএসকে। ফলে ব্যবসা বিক্রি নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা।

এ অবস্থায় সুরক্ষা চেয়ে জিএসকে কর্তৃপক্ষকে একটি লিগ্যাল নোটিস পাঠিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা। কর্মীদের পক্ষে লিগ্যাল নোটিসটি করেছেন জিএসকের কনজ্যুমার হেলথকেয়ার বিজনেস ইউনিটের একজন টেরিটরি অফিসার। মূল কোম্পানির পাশাপাশি জিএসকে বাংলাদেশের চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, কান্ট্রি এইচআর হেড ও কোম্পানি সেক্রেটারি বরারর নোটিসটি পাঠানো হয়েছে। নোটিসের একটি কপি ইউনিলিভার বাংলাদেশের কাছেও সরবরাহ করেছেন জিএসকের কর্মীরা।

জিএসকের কর্মীরা বলছেন, তাদের বর্তমান নিয়োগকর্তা প্রতিষ্ঠান কর্মীদের চাকরির সুরক্ষার বিষয়ে কোনো ধরনের লিখিত ডকুমেন্ট সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। যেসব কর্মী ইউনিলিভারের মালিকানায় চাকরি অব্যাহত রাখতে চান, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের ‘রিটেনশন এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর হয়নি। এটা জিএসকে যেমন করেনি, তেমনি এ ধরনের উদ্যোগ ইউনিলিভারও নেয়নি। বিপরীতে যেসব কর্মী আর চাকরি অব্যাহত রাখতে চান না, তাদের জন্যও কোনো ধরনের ‘সেপারেশন স্কিম’ চালু হয়নি। অধিগ্রহণের পর ইউনিলিভার যেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের ছাঁটাই করতে না পারে, সেজন্যও কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখেনি জিএসকে কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে চাকরি নিয়ে অন্ধকারে রয়েছেন জিএসকের কনজ্যুমার হেলথকেয়ার বিজনেস ইউনিটের কর্মীরা।

লিগ্যাল নোটিসটি দেয়া হয় গত ৫ মার্চ। এরই মধ্যে এ লিগ্যাল নোটিসের জবাবও দিয়েছে জিএসকে। ১১ মার্চ দেয়া জবাবে বলা হয়, ‘যদি’ এবং ‘যখন’ প্রয়োজন হবে বিষয়টি নিয়ে কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

এর বাইরে জিএসকে কর্মীদের লিগ্যাল নোটিসকে ‘অপরিপক্ব’ হিসেবে অভিহিত করে এতে আরো বলা হয়েছে, এ সময় এ ধরনের পদক্ষেপের কোনো দরকার ছিল না। নিয়োগের সময় কর্মীদের সঙ্গে করা চুক্তি ও বিদ্যমান আইন-কানুন অনুসরণ করেই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হচ্ছে।

কর্মীদের এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জিএসকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বণিক বার্তা। অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির একজন মুখপাত্র বলেন, ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর জিএসকের (গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন) কনজ্যুমার হেলথকেয়ার নিউট্রিশন ব্র্যান্ডগুলোর মালিকানার বৈশ্বিক বিভক্তির ঘোষণা অনুযায়ী জিএসকে বাংলাদেশ লিমিটেড যথাযথ প্রক্রিয়া ও অনুমোদন সাপেক্ষে তাদের শেয়ার ইউনিলিভারের কাছে বিক্রি করবে। জিএসকে বাংলাদেশের কর্মীদের ওপর এ লেনদেনের কোনো প্রভাব পড়বে না।