নারায়ণগঞ্জ রুপগঞ্জে হাশেম ফুড বেভারেজ কোম্পানির জুস কারখানায় অগ্নিকান্ডে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৫২ জন।পুলিশ পাহারায় রূপগঞ্জ ফ্যাক্টরি থেকে ৪৯ জনের মরদেহ নেওয়া হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে। ফায়ার সার্ভিসের ডেমরা স্টেশন জানান,পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স করে লাশগুলো শুক্রবার বিকেল ২.৩০ মিনিটে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বণিক বার্তাকে জানান, ঘটনা তদন্তে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন।আগুনে সব মিলিয়ে ৫২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহত প্রত্যকের পরিবারকে লাশ দাফন কাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকা ও গুরুতর আহতদের পরিবারকে দশ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় নারায়ণগঞ্জ রুপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা ইউনিয়নের কর্ণগোপ এলাকায় সেজান জুসের নামের পরিচিত হাশেম ফুড কারখানায় আগুন লাগে।
আগুন নেভাতে ধীরগতির অভিযোগ তুলে কারখানার শ্রমিকদের আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসি ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে। তাদেরকে সড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে তাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এসময় অবরোধকারীরা মিডিয়ার গাড়িসহ বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করে।
ডিএনএ টেষ্টের মাধ্যমে লাশ শনাক্ত হবে
ফায়ার ব্রিগেডের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান আরো জানান, আজ শুক্রবার যেসব লাশ উদ্ধার হয়েছে তার প্রায় সবই এমনভাবে দগ্ধ যে সেগুলি আত্মীয়রা দেখে চিনতে পারছেন না। তাই এই মৃতদেহগুলি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে ডিএনএ টেষ্টের জন্য। ডিএনএ টেষ্টের মাধ্যমে এ লাশগুলি সনাক্ত করে আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তিনি জানান, আগুন প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রনে আনার পরে নিচ তলা থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত সার্চ করে ৪৯ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রনে এনে পুরো ভবনটিতে আমরা চিরুনি তল্লাশি চালাবো। কোথাও কারো লাশ পড়ে আছে কিনা তা খুঁজতে।
প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক তাজুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম জানান, এ ভবনে লিফট থাকলেও লিফট ব্যবহারের অনুমতি ছিলো শুধু কর্মকর্তাদের। যে কারনে ঘটনার সময়ও শ্রমিকরা লিফটে উঠতে পারেনি।
একাধিক মামলা দায়ের হচ্ছে
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম বলেন, সজিব কর্পোরেশনের হাসেম ফুড এন্ড বেভারেজের সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকান্ডে অনেকগুলি প্রাণ ঝড়েছে। এ ঘটনায় যদি মালিক পক্ষের কোনো গাফিলতি পাওয়া যায় অবশ্যই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। মালিক যাতে বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারে এ ব্যাপারে বিমান বন্দরসহ সব জায়গায়ই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় এক বা একাধিক মামলা হবে। এ প্রতিষ্ঠানে যদি শিশু শ্রমিক নিয়োগের প্রমান পাওয়া যায় তাহলে আলাদা আইনগত ব্যবস্থা হবে। তিনি বলেন, নিহতদের লাশ ঢাকা মেডিক্যালে পাঠানো হয়েছে। সেখানে জেলা পুলিশের একটি ও ঢাকা ডিএমপি পুলিশের একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। যাতে নিহতদের স্বজনরা যোগাযোগ করে তাদের স্বজনকে সনাক্ত করতে পারে।
একই সাথে তিনি বলেন, যেসব মরদেহ সনাক্ত করা যাবেনা সিআইডি ক্রাইম সিনের মাধ্যমে তাদের নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হচ্ছে। ডিএনএ টেষ্টের মাধ্যমে এগুলি সনাক্তের পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার দুই জায়গায় সিআইডি ও পিআইবি’র একাধিক টিম কাজ করছে।
সেজান জুস কারখানা
প্রতিষ্ঠানের নাম হাসেম ফুড বেভারেজ হলেও এলাকাবাসি এটাকে চেনে সেজান জুস কারখানা হিসেবে। সেজান জুস মূলত পাকিস্থানের একটি পণ্য। হাসেম ফুডেরই অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সজীব কর্পোরেশন। বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে এখানে সেজান জুস তৈরী বাজারে সরবরাহ করে আসছিলো। এ কারখানার ভেতরে জুসের পাশাপাশি নুডুলস, লাচ্ছি সেমাই, চকলেট, লাচ্ছি, কেক বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরী ও প্যাকেটজাত করা হতো।
এই ভবনের নিচ তলায় ছিলো বিপুল পরিমান ফয়েল কাগজের (রাংতা কাগজ) কয়েল। বিপুল পরিমান কার্টন ও পরিত্যাক্ত কাগজ। যেগুলি সিড়ির নিচে স্তুপ করা ছিলো। নিচের ফ্লোরের পাশের একটি কক্ষে ছিলো বড় আকৃতির একটি বিদ্যুতের ট্রান্স ফর্মার। দ্বিতীয় তলায় শ্রমিকরা বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও প্যাকেটিংয়ের কাজ করতো। তৃতীয় তলায় ছিলো দুইটি হিট মেশিন। যেগুলি দিয়ে প্লাষ্টিক গলিয়ে উৎপাদিত পণ্যের মোড়ক তৈরী করা হতো। ভবনের চারতলার উত্তর দিকে ছিলো বিশাল আকৃতির ষ্টোর রুম। এছাড়া ছয় তলা ভবনের প্রতিটি ফ্লোরেই ছিলো দাহ্য পদার্থ ও বিপুল পরিমান রাসায়নিক পদার্থের মজুদ।
প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক আবুল কাশেম জানান, নিচ তলার সিড়ির পাশের কার্টনে আগুনের সূত্রপাত হয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুন দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় উঠে পড়ে। যে কারনে দ্বিতীয় তলার শ্রমিকরা নিচে নামতে না পেরে ভবনের সামনের অংশের সার্টার ভেঙ্গে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়।
আগুন লাগার প্রায় বাইশ ঘন্টা পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসলে বিশাল ভবনটি ঘুরে দেখা যায় আগুনে প্রতিটি ফ্লোরে মেশিনারিজসহ বিপুল পরিমাণ পণ্য পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছে। দ্বিতীয় তলার উত্তর পাশে বিকেল সাড়ে চারটায়ও আগুন জ্বলতে দেখা যায়। তৃতীয় তলায়ও একই চিত্র দেখা যায়। তবে চতুর্থ তলার চিত্রটি ছিলো সবচেয়ে ভয়াবহ। এখানে মানুষের শরিরের পোড়া অংশ, কোথাও পায়ের জুতো,স্যান্ডেল, মেয়েদের হ্যান্ড ব্যাগের পোড়া অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। শুক্রবার যাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয় তাদের বেশিরভাগকে এ ফ্লোর থেকেই উদ্ধার করা হয়।
মহাসড়ক অবরোধ
আগুন নেভাতে ধীরগতির অভিযোগ তুলের সকাল সাড়ে দশটায় হতাহত শ্রমিকদের আত্মীয়রা ও এলাকাবাসি প্রতিষ্ঠানের অদূরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কর্ণগোপ এলাকা লাঠি সোটা নিয়ে অবরোধ করে। তারা এসময় সাংবাদিকদের গাড়িসহ বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে। খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাদের বাধা দিলে দু-পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ও কয়েক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। অবরোধকারিরা পুলিশকে লক্ষ করে ইট, পাথর, রাস্তার পাড়ে থাকা হকারদের চকি ভেঙ্গে ছুড়তে থাকে। বেলা পৌনে বারোটায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
অবরোধকারিদের একজন হাশেম ফুড বেভারেজের শ্রমিকের আত্মীয় আসলাম মিয়া জানান, তার ভাগ্নি লিনা এ কারখানায় কাজ করে। আগুনের পর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা। লিনাসহ কারখানার আরো বেশ কয়েকজন শ্রমিকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা বলে তিনি দাবী করেন। তিনি কারখানার আগুন নেভাতে ধীরগতির অভিযোগ করেন।
ক্ষুব্ধ জনতার হামলা ভাংচুর
দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বললে নেভাতে না পারার কারনে ক্ষুব্ধ স্হানীয় লোকজন সাংবাদিক ও পুলিশের উপর হামলা চালিয়ে ভাংচুর করেছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে দশটার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলা কারিরা কারখানার মেইন গেইটের সাথে থাকা আনসার ক্যাম্পে হামলা চালেয়ে তিনটি শটগান ছিনিয়ে নিয়ে যায়। খোয়া যাওয়া তিনটি শটগানের মধ্যে দুটি উদ্বার করেছে। বাকি একটি শটগান এখনো উদ্বার করা যায়নি। এসময় হামলাকারিরা কারখানার অভ্যন্তরে থাকা বেশ মোটরসাইকেল ভাংচুর করে এবং কারখানায় ভাংচুর চালায়।
ক্ষুব্ধ লোকজনের অভিযোগ গতকাল আগুন লাগার পর তারা নেভাতে চাইলে গেইটের সামনে সিকিউরিটি গার্ডরা খারাপ ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় চলে যাওয়ার পরও আগুন নেভাতে না পারায় সকালে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে ।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম জানান, স্থানীয় উৎসূক জনতা কিছুটা উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলো। পরে পুলিশ তা নিয়ন্ত্রনে অনেন। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে। কারখানায় ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে।
ফায়ার সার্ভিসের রূপগঞ্জের কাঞ্চন, ডেমরা, আদমজী, ঢাকা, ও নারায়ণগঞ্জ স্টেশন থেকে ১৮টি ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করছে।










