সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) হামের উপসর্গ নিয়ে আরো আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯৭ শিশুর। এছাড়া নতুন করে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৯৭৪ জন। গতকাল বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুর এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দেশে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকাদানের বাইরে রয়েছে। পাশাপাশি অনেক পরিবার রোগের শুরুতেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন না হয়ে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসে। এতে রোগ জটিল আকার ধারণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারিভাবে বলা হচ্ছে হামের টিকার কাভারেজ প্রায় ৯৯ শতাংশ। বাস্তবে যদি তা নিশ্চিত হতো, তাহলে হামে মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি হওয়ার কথা নয়। এর অর্থ এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে রয়েছে। পূর্ণ টিকা কাভারেজ নিশ্চিত না হলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে না। অন্যদিকে অভিভাবকদের মধ্যেও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। অনেকেই শিশুর অবস্থা গুরুতর হওয়ার পর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। ফলে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়ে যায়। তাই ইউনিয়ন ও কমিউনিটি পর্যায় থেকেই রোগ শনাক্ত, পরামর্শ ও দ্রুত রেফারের ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে কার্যকর করা ছাড়া এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৬৮৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে আরো ৯৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালে রোগীর চাপও বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৪১ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ১৫ শিশু।
হাম ও হামের উপসর্গে ১০ জুলাই তিনজন, ১১ জুলাই তিন, ১২ জুলাই পাঁচ, ১৩ জুলাই এক, ১৪ জুলাই সাত, ১৫ জুলাই পাঁচ এবং সর্বশেষ গতকাল ১৬ জুলাই আরো আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র সাতদিনেই হামের উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছে ৩২ শিশু। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং এখনো বড়সংখ্যক শিশু টিকার বাইরে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকাবঞ্চিত শিশুদের খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, দ্রুত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ, কার্যকর রোগ নজরদারি এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ আরো জোরদার করতে হবে। অন্যথায় সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্যুর যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা আরো বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা। কিন্তু এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু টিকা পায়নি। ভিটামিন এ কর্মসূচি এবং হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় থাকা শিশুদের সংখ্যার মধ্যে প্রায় ৪৬ লাখের পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৪৬ লাখ শিশু এখনো হামের টিকার বাইরে। সরকারের উচিত আবারো বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে এসব শিশুকে শনাক্ত করা এবং দ্রুত টিকা দেয়া। একই সঙ্গে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটি পর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে।’










