দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর দিকে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অবকাঠামোস্বল্পতা ছিল চরমে। সংক্রমণ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোগান্তি বাড়তে থাকে রোগীদের। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে যা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। তবে করোনা শুরুর পর বেসরকারি পর্যায়ে আইসোলেশন সেন্টার স্থাপনসহ সরকারি স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো।
চলতি বছরের মে মাস থেকে দেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে থাকে। বিশেষ করে ডেল্টা ধরনে (ভারতে উত্পত্তি) বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দেশের স্বাস্থ্য খাত। শহরের পাশাপাশি এ সময় গ্রাম অঞ্চলেও ব্যাপক হারে সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে। হাসপাতালগুলোতে বাড়তে থাকে রোগীর চাপ। ফলে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম সংকট তীব্র হতে শুরু করে। বিশেষ করে অক্সিজেন। তবে করোনার এ অভিঘাত মোকাবেলায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুতই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এগিয়ে এসেছে চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব বড় শিল্প গ্রুপ। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের আবুল খায়ের গ্রুপ, জিপিএইচ ইস্পাত, বিএসআরএম, এস আলম গ্রুপ, সিকম গ্রুপ, মোস্তফা হাকিম গ্রুপ, এলবিয়ন গ্রুপ, কেডিএস গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, কেএসআরএম গ্রুপ, এসএ গ্রুপ, সাইফ পাওয়ারটেকসহ বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ। করোনার চিকিৎসাসামগ্রী, ত্রাণসহায়তা, অক্সিজেনসহ বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে আসছে এসব প্রতিষ্ঠান।
জানা গেছে, করোনার প্রকোপ বাড়তে থাকায় আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি বিভিন্ন সহযোগিতা করে আসছে করপোরেট এ গ্রুপগুলো। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত অক্সিজেন, খাদ্যসামগ্রী, আমদানি করা ভেন্টিলেটর, ওষুধসামগ্রীসহ নগদ অর্থসহায়তা দিয়ে আসছে এসব শিল্প পরিবার। দুস্থ মানুষের জন্য মাসভিত্তিক খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিও হাতে নিয়েছে তারা। শিল্প-কারখানার জন্য অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে করোনা আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
দেশে করোনার প্রথম ঢেউ শুরুর পর থেকেই বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহসহ অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে আসছে চট্টগ্রামভিত্তিক মোস্তফা হাকিম গ্রুপ। শিল্প গ্রুপটির পরিচালক সরওয়ার আলম এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশে অক্সিজেনের চাহিদা বেড়েছে। সংক্রমণ পরিস্থিতিতে যেন সংকট তৈরি না হয় তাই এগিয়ে আসি। করোনার প্রথম ঢেউ চলার সময় থেকেই নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে, উপজেলায়ও আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ করেছি সাধ্যমতো। অক্সিজেন ছাড়াও কভিডকালে নানামুখী সহায়তা দিতে মোস্তফা হাকিম গ্রুপ চেষ্টা করছে।
চট্টগ্রামের করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য সবচেয়ে বেশি সহায়তা এসেছে অক্সিজেন ও অক্সিজেন সিলিন্ডার। দেশের ইস্পাত খাতের দুই জায়ান্ট শিল্প গ্রুপ জিপিএইচ ইস্পাত ও আবুল খায়ের গ্রুপ এ সেবায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে এসেছে। নিজেদের শিল্প গ্রুপের প্রয়োজনে উৎপাদিত অক্সিজেন করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠান দুটো।
এর মধ্যে জিপিএইচ ইস্পাত অক্সিজেন সরবরাহের পাশাপাশি এক হাজার অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করেছে। করোনাকালে আক্রান্ত রোগীদের পাশে দাঁড়াতে ‘করোনা আক্রান্তদের জীবন সঞ্জীবনী অক্সিজেন’ স্লোগান নিয়ে নতুন এয়ার সেপারেশন ইউনিট স্থাপন করে জিপিএইচ। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত জিপিএইচ ইস্পাতের নতুন প্লান্টে বসানো হয় দৈনিক ৩০০ টন উৎপাদন সক্ষমতার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ও দেশের সর্ববৃহৎ এয়ার সেপারেশন প্লান্ট। যেখানে প্রতিদিন ২২০ টন বায়বীয় অক্সিজেন, ২২ থেকে ২৫ টন তরল অক্সিজেন উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে নিজেদের ইস্পাত উৎপাদন ও পরিশোধনে ব্যবহার করা হচ্ছে দৈনিক ১৫০ টন। আর তরল অক্সিজেন স্পেক্ট্রর মাধ্যমে বাকিটা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অংশ হিসেবে বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ প্লান্টে প্রতিদিন বায়বীয় নাইট্রোজেন, তরল নাইট্রোজেন ও তরল আর্গন গ্যাস তৈরি হচ্ছে। করোনার সংকটকালীন জিপিএইচ ইস্পাত প্রথমবারের মতো দেশের প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল, ফিল্ড হাসপাতাল এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে অক্সিজেন বিতরণ করেছে। করোনা মহামারীতে অক্সিজেনের সংকটকালে যেকোনো প্রতিকূলতায় মানুষের পাশে থাকতে চায় শিল্প গ্রুপটি। মানুষের জন্য কাজ করায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) মোহাম্মদ আলমাস শিমুল বণিক বার্তাকে বলেন, জরুরি মুহূর্তে দেশে অক্সিজেনের সংকট যেন না হয়, সে ব্যাপারে আমরা সচেতন ছিলাম। সীতাকুণ্ডের ইস্পাত কারখানায় রড উৎপাদনে ব্যবহারের জন্য গ্যাসীয় অক্সিজেন ব্যবহার হচ্ছে শিল্পে। আমাদের উৎপাদিত অক্সিজেন থেকে প্রাপ্ত তরল অক্সিজেনের প্রায় পুরোটাই করোনা দুর্যোগে বিনামূল্যে হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করেছি। স্বাস্থ্য খাতে দরকার হয় কমপক্ষে ৯৯ দশমিক ৫০ শতাংশ বিশুদ্ধ অক্সিজেন। সেখানে আমাদের সরবরাহ করা অক্সিজেনের বিশুদ্ধ মানবতার চেয়েও বেশি।
এদিকে চট্টগ্রামের ২০টি হাসপাতালে বিনামূল্যে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করে দিয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপ। অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মেডিকেল অক্সিজেন সহায়তা কার্যক্রম বাড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তরল অক্সিজেন সরবরাহ ১৫ থেকে ২০ টন থেকে বাড়িয়ে এখন প্রায় ৩০ টনে উন্নীত করেছে তারা। হাসপাতালগুলোয় প্রতিদিন সাত টন তরল অক্সিজেন দেয়ার সক্ষমতা থাকলেও এখন তা বাড়িয়ে করা হয়েছে প্রায় ৩০ টন। এছাড়া প্রতিদিন রিফিল করা হচ্ছে ৫০০ সিলিন্ডার। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর থেকে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ব্যক্তি পর্যায়ে ১৮ হাজারের বেশি অক্সিজেন সিলিন্ডার বিনামূল্যে রিফিল করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। জরুরি প্রয়োজনে অক্সিজেন পৌঁছে দিতে একটি হটলাইন সেবাও চালু করেছে গ্রুপটি। এছাড়াও প্রতিটি ১০-২২ হাজার টাকা দামের পাঁচ হাজারের বেশি অক্সিজেন সিলিন্ডার গ্যাসসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও করোনা আইসোলেশন সেন্টারে অনুদান হিসেবে দেয়া হয়েছে। করোনায় অক্সিজেন সংকট শুরুর পর প্রথম দিকে ১ দশমিক ৪ কিউবিক মিটারের অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল করা হলেও পরে ৭ দশমিক ৫ কিউবিক মিটারের অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল করা হয়।
ইস্পাত তৈরির ক্ষেত্রে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বনের প্রয়োজন হয়। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শীতলপুরে অবস্থিত তাদের ইস্পাত কারখানার প্রয়োজন মেটাতে ২০১২ সালে বহুজাতিক কোম্পানি লিন্ডে বাংলাদেশের সহায়তায় অক্সিজেন প্লান্ট নির্মাণের কাজ শুরু করে আবুল খায়ের গ্রুপ। ২০১৫ সালে প্লান্টটিতে উৎপাদন শুরু হয়। এটির দৈনিক অক্সিজেন উৎপাদনের সক্ষমতা ২৬০ টন। গত বছর দেশে করোনা মোকাবেলায় অতি জরুরি অক্সিজেনের প্রয়োজনে একেএস প্লান্টে উৎপাদিত অক্সিজেন জনস্বার্থে উন্মুক্ত করে দেয় আবুল খায়ের গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব উদ্যোগে ২০টি হাসপাতালে বিনামূল্যে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করে দিয়েছে। চিকিৎসা কাজে অক্সিজেন প্রক্রিয়াকরণের জন্য নতুন করে সরঞ্জামাদি সংযোজন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি বিদেশ থেকে ৩০০টি অক্সিজেন সিলিন্ডারও আমদানি করেছে তারা।
করোনার অভিঘাত মোকাবেলায় বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ করেছে চট্টগ্রামের আরেক শিল্পগ্রুপ কেএসআরএম। শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির পরিচালক এনামুল হক কভিডকালে নিজেদের সিএসআর কার্যক্রম সম্পর্কে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রথমদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহের উদ্যোগ নেয় কেএসআরএম। মানুষের প্রয়োজনেই অক্সিজেন তৈরির কারখানায় মেডিকেল অক্সিজেন উৎপাদন করে, তা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ করেছি। এটি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতারই অংশ। কভিডকালে চট্টগ্রামের শিল্পগ্রুপগুলোর এ উদ্যোগ আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশা করেন তিনি।
কভিড-১৯ মোকাবেলায় চট্টগ্রামের শিল্পগ্রুপগুলোর নিরবচ্ছিন্ন এ সহায়তা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বিতীয় দফায় ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থায় স্থানীয়ভাবে অক্সিজেন উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত চট্টগ্রামের একাধিক শিল্পগ্রুপ করোনা মোকাবেলায় দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রেখেছে। শুধু চট্টগ্রামে নয়, দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে করোনাকালে সিএসআর কার্যক্রমকে শতভাগ ব্যবহার করেছে তারা। সারা দেশের অন্য বড় উদ্যোক্তারা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের মতো শতভাগ সিএসআর কার্যক্রম পরিচালিত করলে কভিডের মতো অতিমারী মোকাবেলায় বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাবে।









