যশোরে পাঁচ বছর আগেও হাতে তৈরি সেমাইয়ের চাহিদা ছিল। ঈদ ঘিরে প্রতিদিন একজন ব্যবসায়ী গড়ে এক হাজার কেজি সেমাই বিক্রি করতেন। বাজার ভালো থাকায় বিসিক শিল্পনগরীর বাইরেও এ অঞ্চলে সেমাই কারখানা গড়ে উঠেছে। তবে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি ক্ষুদ্র এ শিল্প। অব্যাহত লোকসানের কারণে গত পাঁচ বছরে ২৫টির অধিক সেমাই কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও ভিন্ন স্বাদের কারণে জনপ্রিয়তা পেয়েছে প্যাকেটজাত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সেমাই। দেশে বছরে সেমাইয়ের চাহিদা ৩০-৪০ হাজার টন, যার বেশির ভাগই সরবরাহ করছে করপোরেট কোম্পানিগুলো। এক দশকের ব্যবধানে এ অবস্থান তৈরি হয়েছে। দুই দশক আগেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় কারখানায় তৈরি সেমাই মানুষের ঘরে ঘরে দেখা যেত। কিন্তু করপোরেট কোম্পানির হাতে বাজার চলে যাওয়ায় আঞ্চলিক কারখানাগুলো এখন সেমাই তৈরিতে আগ্রহ হারাচ্ছে। এমনকি এ ধরনের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

শেখহাটি হাইকোর্ট মোড়ে ছয় বছর আগে স্থাপান হয় জননী সেমাই মিল। প্রথম বছর ভালো ব্যবসা হওয়ায় বড় পরিসরে উৎপাদনে যেতে ২০ লাখ টাকা ঋণ করেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী শচীন বিশ্বাস। কিন্তু পরের বছর থেকে হঠাৎই বাজারে খোলা সেমাইয়ের চাহিদা কমে যায়। এরপর আসে কভিডের প্রকোপ। তারপর আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এখন ঋণে জর্জারিত হয়ে বন্ধ হতে বসেছে। গুটি কয়েক শ্রমিক নিয়ে চলছে কার্যক্রম। অর্ডার পেলে তবেই হচ্ছে উৎপাদন।

শচীন বিশ্বাস জানান, বর্তমানে ভাজা ও লাচ্ছা সেমাইয়ের চাহিদা বেশি থাকায় আগের মতো খোলা সেমাই বিক্রি হচ্ছে না। এছাড়া উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। ব্যয় অনুযায়ী লাভ না হওয়ায় অনেকেই মিল বন্ধ করে শুরু করেছেন অন্য ব্যবসা।

একই অবস্থা যশোর বিসিক শিল্পনগরীতে। গত পাঁচ বছরে এখনকার ফ্লাওয়ার মিলগুলোর অধিকাংশই সেমাই উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। বর্তমানে জনতা সেমাই কল, সিটি ফ্লাওয়ার মিল, বিবি ফ্লাওয়ার মিল, পূর্বাণী ফ্লাওয়ার মিল অর্ডারনির্ভর সেমাই উৎপাদন করছে।

পূর্বাণী ফ্লাওয়ার মিলের ম্যানেজার মো. রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই হাতে তৈরি সেমাইয়ের বাজার নিম্নমুখী। তবে এ বছর বেশি প্রভাব পড়েছে। প্রতি বছর এমন সময় সেমাই শ্রমিকরা ব্যস্ত থাকেন। এ বছর চাহিদা না থাকায় সেই ব্যস্ততাও কমেছে। রমজানের শুরু থেকে দিনে গড়ে এক হাজার কেজি সেমাই বিক্রি হতো। কিন্তু এখন সেই বাজার নেমেছে ৪০০-৫০০ কেজিতে।’

কারখানার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক কেজি সেমাই পাইকারি বিক্রি হয় ৪৫-৫০ টাকা, যার উৎপাদন ব্যয় ৪২-৪৮ টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে বাকি বিক্রি। তাছাড়া হাতে তৈরি সেমাইয়ের তুলনায় বাজারে ভাজা সেমাই ও বিভিন্ন করপোরেট কোম্পানির সেমাইয়ের চাহিদা বেশি। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ২৫টির অধিক সেমাই কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে শহরের জামরুলতলা এলাকার ফয়সাল সেমাই, ছোট শেখহাটির কুসলুম সেমাই ঘর, ঝুমঝুমপুর বটতলার মা ফ্লাওয়ার অ্যান্ড সেমাই, বিসিকের সিটি ফ্লাওয়ার, রিমন ফ্লাওয়ার অ্যান্ড সেমাই ও রাজারহাটের ওহিদ ফ্লাওয়ার অ্যান্ড সেমাই উল্লেখযোগ্য।

এ বিষয়ে যশোর বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি সাকির আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সেমাই তৈরিতে মনোযোগী হওয়ায় ছোট বেকারিগুলো পণ্যটির উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। একসময় স্থানীয় কারখানায় তৈরি সেমাই জনপ্রিয়তা পেলেও এখন বড় কোম্পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকতে পারছে না মাঝারি বা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো। এর বাইরে আরো কিছু ব্যবসায়ী শুধু ঈদে সেমাই তৈরি করতেন। সেগুলো এখন নেই। তারা খরচের সঙ্গে টিকতে পারছেন না। এর মধ্যে এ বছর ময়দা, চিনি তেলসহ অন্য সব উপকরণের দাম বাড়ার কারণে অনেকে লোকসানের আশঙ্কায় সেমাই তৈরি বন্ধ করে দিয়েছেন।’