দ্বীপ জেলা ভোলায় গত এক মাসে ১ হাজার ৩৭৭ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। করোনায় বিপর্যস্ত অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। তার পরও জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশই সরকারি ত্রাণ পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ত্রাণের দাবিতে কাজ হারানো শ্রমিক-মজুররা রাস্তায় বিক্ষোভ-মানববন্ধনও করেছেন। এর মধ্যেই জেলার দৌলতখান ও লালমোহন এলাকায় অন্তত ৫০ বস্তা ত্রাণের চাল উদ্ধার হয়েছে, যেগুলো ‘চুরি’ করেছিলেন কয়েকজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারদলীয় নেতাকর্মী।

গত বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহে এক ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ওই ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সরকারি ত্রাণ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে অসহায় মানুষদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করছিলেন। জেলায় এখনো আড়াই হাজার টনের বেশি চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তার পরও এখানে বিক্ষোভ করেছেন ত্রাণবঞ্চিত মানুষ।

সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত দেশের ৬৬টি জেলায় শিশুখাদ্যসহ অন্যান্য সামগ্রী কেনার জন্য ৬৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা নগদ সহায়তা করা হয়েছে। একইভাবে জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৬৭ টন চাল। দেশের ৫০ লাখ পরিবারকে পরিবারপ্রতি ২০ কেজি করে খাদ্যসহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ত্রাণ মন্ত্রণালয় ছাড়াও খাদ্য মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও নিজ নিজ মন্ত্রণালয় থেকে দরিদ্র অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, খাদ্য মন্ত্রণালয় ১০ টাকা কেজি দরে দরিদ্র ৫০ লাখ পরিবারকে ৩০ কেজি করে চাল দিচ্ছে। এছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ভিজিডি কর্মসূচির আওতায় ১০ লাখ ৪০ হাজার পরিবারকে খাদ্যসহায়তা অব্যাহত রাখছে। তাতে সব মিলিয়ে চলতি মে মাসে সারা দেশে প্রায় দেড় কোটি পরিবার সরকারের খাদ্যসহায়তা পাবে।

গত ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ঝালকাঠি জেলায় ১ হাজার ২৩৩ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তবে এ জেলায় বরাদ্দ হওয়া ত্রাণের সুষম বণ্টন হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভও করেছেন ত্রাণবঞ্চিত অসহায় মানুষ। তাদের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত তারা কোনো ধরনের সরকারি কিংবা বেসরকারি ত্রাণ বা খাদ্যসহায়তা পাননি। ঝালকাঠির পৌর কাউন্সিলররা সুষমভাবে ত্রাণ বিতরণ করছেন না। আত্মীয়-স্বজন এবং কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করছেন। ফলে অনেকেই ত্রাণবঞ্চিত হচ্ছেন।

ত্রাণ নিয়ে কম-বেশি দেশের সব জেলা থেকেই অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ত্রাণবঞ্চিতের বিক্ষোভের খবর আসছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার সামর্থ্য অনুযায়ী ‘পর্যাপ্ত’ বরাদ্দ দিলেও সেগুলোর যথাযথ বিলিবণ্টন হচ্ছে না। ফলে দেশের প্রকৃত অসহায় জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ ত্রাণ সুবিধার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

ত্রাণ কার্যক্রমে এ অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করতে না পারলে করোনা সংকট দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরো ঘনীভূত হবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ত্রাণ নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি আমাদের দেশের একটি পুরনো সমস্যা। অতীতের মতো বর্তমানের সংকটকালেও ত্রাণ নিয়ে নয়ছয় হচ্ছে। অনিয়ম-দুর্নীতি ঠেকাতে স্থানীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী মনিটরিং কমিটি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ কমিটিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন, সুশীল সমাজ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসহ সর্বস্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নগদ অর্থের বদলে খাদ্যসহায়তার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেন তিনি।

সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোগেও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগেও পরিচালিত হচ্ছে ত্রাণ কার্যক্রম। তবে এ ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমকে দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত রাখাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ড. সেলিম রায়হান। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এক মাসের বেশি হতে চলল দেশে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সবকিছু বন্ধ রয়েছে। এ সময়টাতে সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এ ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমকে অব্যাহত রাখা। কারণ, এখনো কিন্তু আমাদের দেশে করোনার বিস্তার কমার কোনো লক্ষণ নেই, উল্টো প্রতিদিনই বাড়ছে। সঙ্গে প্রকট হচ্ছে দেশের হতদরিদ্র মানুষের সংকট। এমন অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার মতো পরিকল্পনা এখন থেকেই সরকারকে করতে হবে।