কপোতাক্ষ নদ খননকাজে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরিকল্পিত সেতু। যশোরের প্রধান নদী হিসেবে পরিচিত কপোতাক্ষ নদ। অথচ দখল-দূষণে এ নদের জীবন নেই বললেই চলে। কপোতাক্ষ নদটির ওপর সেতু রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে ১৫টি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। মাত্র একটি সেতু নিয়ম মেনে করা হয়েছে।
নিচু করে নির্মাণ করা সেতুর কারণে নদের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাণ ফিরিয়ে দিতে বর্তমানে এ নদে খননকাজ শুরু হচ্ছে। কিন্তু এসব সেতুর কারণে নদ খননের সুফল নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্র জানায়, অভ্যন্তরীণ জলপথ ও তীর ভূমিতে স্থাপনা নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০১০ অনুযায়ী, দেশে চার শ্রেণীর জলপথ রয়েছে। কপোতাক্ষ নদ তৃতীয় শ্রেণীর জলপথের আওতাভুক্ত। তৃতীয় শ্রেণীর জলপথে নদনদীর ওপর নির্মিত সেতুর উচ্চতা হবে পানির স্তর থেকে গার্ডারের নিচ পর্যন্ত ২৫ ফুট।
যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নে তাহেরপুর গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ভৈরব নদ। তাহেরপুর সেতু থেকে কয়েকশ গজ দূরে ভৈরব দুই ভাগ হয়েছে। পুব বা বাঁদিকে মূল ভৈরব, আর ডান বা পশ্চিম দিকের শাখাটি কপোতাক্ষ। তাহেরপুর থেকে যাত্রা শুরু করে, সাতক্ষীরা হয়ে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার শিববাড়ীতে গিয়ে শেষ হয়েছে কপোতাক্ষ। সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা বলছেন, কপোতাক্ষ নদের দৈর্ঘ্য ১৮০ কিলোমিটার।
একসময় কপোতাক্ষ নদ ছিল প্রমত্তা। বিদেশের মাটিতে বসে নিজের শৈশবের কপোতাক্ষ নদের কথা মনে করে কালজয়ী কবিতা লিখেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ‘সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে/সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।’
খরস্রোতা সেই নদ স্মৃতিকাতর করে তুলেছিল কবিকে। বর্তমানে কপোতাক্ষের কোথাও শুকনো খটখটে, আবার কোথাও সরু খালের মতো জমে আছে পানি আর তার ওপর ভর করেছে রাজ্যের কচুরিপানা।
২০১১ সাল থেকে ‘কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’ বাস্তবায়ন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ২৮৬ কোটি ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প ২০১৭ সালে শেষ হয়। প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় পাখিমারার বিলে জোয়ারাধার (টিআরএম-টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) বাস্তবায়ন করে পাউবো। পুনরায় ‘কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)’ গ্রহণ করা হয়েছে। ৫৩১ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২০ সালে শুরু হয়েছে এবং ২০২৪ সালে তা শেষ হবে।
কপোতাক্ষ নদের ওপর অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা সেতুগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইড) ৭টি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তরের দুটি, সড়ক ও জনপথের (সওজ) তিনটি, বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি সেতু রয়েছে। স্থানীয় জনগণ একটি সেতু নির্মাণ করেছেন।
কপোতাক্ষ নদ নিয়ে গত ১৮ বছর যাবত আন্দোলন করছে যশোরের কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলন। সংগঠনটির উপদেষ্টা ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন,
নীতিমালা লঙ্ঘন করে কপোতাক্ষের ওপর নিচু সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এতে করে নদীটি অনেক আগেই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
যশোর পাউবো কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম বলেন, কপোতাক্ষ নদের প্রস্থ ৭০-১০০ মিটার পর্যন্ত আছে। তবে সেতুর উচ্চতার বিষয়টি দেখে বিআইডব্লিউটিএ। নদের ওপর নির্মিত সেতুগুলোর যে দৈর্ঘ্য রয়েছে তাতে নদটি পুনর্খননে কোনো সমস্যা হবে না।
নদের ওপর নিচু সেতু নির্মাণের বিষয়ে এলজিইডি যশোর, কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম আনিসুজ্জামান বলেন, কপোতাক্ষ নদের ওপর সেতুগুলো আগেই নির্মাণ করা হয়েছে। সেগুলোতে কিছুই করার নেই। এখন থেকে যে সেতুগুলো নির্মাণ করা হবে সেগুলো বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন নিয়েই করা হবে।
সরেজমিন সেতুগুলো ঘুরে দেখা গেছে, চৌগাছা উপজেলার নারায়ণপুর এবং চৌগাছা সেতু নির্মাণ করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। নারায়ণপুর সেতুর দৈর্ঘ্য ১১১ দশমিক ২৬ মিটার এবং প্রস্থ ৭ দশমিক ৬০ মিটার। ২০১৫ সালে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। চৌগাছার সেতুর দৈর্ঘ্য ৫০ দশমিক ১৪ মিটার এবং প্রস্থ ১০ দশমিক ২৫ মিটার। ২০১৬ সালে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। তবে সেতু দুটি উচ্চতা জানাতে পারেনি সওজ বিভাগ।
কপোতাক্ষের পাশেই বাড়ি চৌগাছা উপজেলার কংসারীপুর গ্রামের একুব্বার আলী সরদারের (৮১)। তিনি বলেন, ২০-২৫ বছর আগেও নদ দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা এবং পালতোলা নৌকা চলত। নিচু করে সেতু নির্মাণের পর নদ দিয়ে নৌকা চলাচল করতে পারে না।
উপজেলার মাশিলা সেতুর দৈর্ঘ্য ৫৮ দশমিক ৮ মিটার এবং প্রস্থ ৫ দশমিক ৫ মিটার। সেতুটি নির্মাণ করেছে এলজিইডি। ২০০৩ সালে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। কাবিলপুর সেতুটি নির্মাণ করা হয় ১৯৮৯ সালে। সেতুর দৈর্ঘ্য ১২০ ফুট। ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তর সেতুটি নির্মাণ করে। পানির উপরিভাগ থেকে সেতুটির গার্ডার পর্যন্ত উচ্চতা প্রায় চার ফুট।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীন ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট ঝিকরগাছা সড়ক সেতু নির্মাণ করছে। ছয় লেনের সেতুটি ১২০ মিটার দীর্ঘ। তবে সেতুটির উচ্চতা পানির স্তর থেকে গার্ডারের নিচ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৯ ফুট।
এ প্রসঙ্গে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও নদী গবেষক ড. সাইবুর রহমান মোল্যা বলেন, অপকল্পিতভাবে গড়ে তোলা সেতুগুলো নদকে গিলে খাচ্ছে। পানি প্রবাহের অভাবে নদটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে কপোতাক্ষ নদটি।









