বেশ কয়েকটি বড় বাণিজ্য অংশীদারের বিরুদ্ধে নতুন তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এশিয়া-ইউরোপের একাধিক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের নামও রয়েছে এ তালিকায়। গত মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতিল করে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। এর পর পদক্ষেপটি নেয়া হলো।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিশন গ্রিয়ার আজ ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১(বি) ধারার অধীনে বিভিন্ন অর্থনীতির দেশগুলোর উৎপাদন খাতের ‘কাঠামোগত অতিরিক্ত সক্ষমতা’ এবং উৎপাদন সংক্রান্ত নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন। তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো, দেশগুলোর কর্মকাণ্ড অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক কি-না এবং তা মার্কিন বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে কি-না, তা নির্ধারণ করা।
তদন্তে যদি কোনো দেশের বিরুদ্ধে অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে ওই দেশের পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক আরোপ করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।
তদন্তের আওতাভুক্ত দেশগুলো হলো চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, বাংলাদেশ, মেক্সিকো, জাপান ও ভারত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার কানাডার নাম তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
রাষ্ট্রদূত গ্রিয়ার বলেন, ‘অন্যান্য দেশ যারা তাদের অতিরিক্ত সক্ষমতা এবং অতি-উৎপাদনের সমস্যা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে, তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আর নিজের শিল্পভিত্তিকে বিসর্জন দেবে না। গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ চেইন দেশে ফিরিয়ে আনা এবং মার্কিন শ্রমিকদের জন্য উৎপাদন খাতে ভালো বেতনের কর্মসংস্থান তৈরির ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অঙ্গীকারকে পুনর্নিশ্চিত করে আজকের এ তদন্তগুলো।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের শিল্পায়নের প্রচেষ্টা বিদেশী অর্থনীতিগুলোর কাঠামোগত অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। অনেক খাতের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বহু বাণিজ্যিক অংশীদার তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি পণ্য উৎপাদন করছে। এই অতি-উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান দেশীয় উৎপাদনকে সরিয়ে দিচ্ছে অথবা মার্কিন শিল্পখাতে এমন নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণে বাধা দিচ্ছে যা অন্যথায় কার্যকর হতো। অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাতে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়েছে অথবা বিদেশী প্রতিযোগীদের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে পিছিয়ে পড়েছে।’
গ্রিয়ার বলেন, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ট্রাম্প যে অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা জুলাইয়ে শেষ হওয়ার কথা। এর আগেই এ বাণিজ্য তদন্ত শেষ হওয়ার আশা করছেন তিনি।
গত বছর এপ্রিলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্প যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা অবৈধ বলে কয়েক সপ্তাহ আগে রায় দেয় যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। রায়ের পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন করে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।
রায়ে বলা হয়েছে জাতীয় জরুরি অবস্থার জন্য সংরক্ষিত আইনকে ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে ট্রাম্প তার এখতিয়ারের সীমা অতিক্রম করেছেন।
সংবিধান অনুযায়ী, এ ধরনের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস রায়ে বলেন, প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের মতো অসাধারণ ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন দেখাতে হবে। তিনি তা করতে পারেন না।
গত বছরের এপ্রিল মাসে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের পণ্যের উপর ১০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে। সেখানে পূর্ব নির্ধারিত শুল্কহার কিছুটা কমিয়ে আনাসহ বাণিজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধিনিষেধও অন্তর্ভুক্ত হয়।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এসব চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। যদিও হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা জানান, শুল্কের বিষয়টি পরিবর্তন হলেও বাণিজ্য চুক্তি বাতিল হচ্ছে না। তাই চুক্তির অধীনে যেসব বিষয়ে সম্মতি বা যেসব শর্ত রয়েছে সেগুলো মেনে চলবে বলেই আশা করে ট্রাম্প প্রশাসন।
অন্যদিকে আদালতের ওই রায়ের পরপরই ট্রাম্প আবারো ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করেন। এটা ১৫ শতাংশে বাড়ানো হবে বলেও তিনি হুমকি দেন।
শেষ পর্যন্ত শুল্ক যত-ই ধার্য করা হোক, নতুন এ তদন্তের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর আরো জোরালোভাবে শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাঠামোগত অতিরিক্ত সক্ষমতা ও উৎপাদনের প্রমাণ লক্ষ্য করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যে দ্বিপক্ষীয় উদ্বৃত্ত প্রায় ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। এ দ্বিপক্ষীয় উদ্বৃত্তের প্রধান অংশ এসেছে বস্ত্র ও পোশাক খাতের রফতানি থেকে।
সরকার দেশীয় বস্ত্র ও চামড়াজাত পণ্যসহ মোট ৪৩টি খাতে রপ্তানির জন্য নগদ প্রণোদনা প্রদান করে থাকে, যা রফতানি কার্যক্রমকে উৎসাহিত করার নীতির অংশ।
এদিকে বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্প সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন মন্দার সময়ে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার চাপে রয়েছে। ২০২৪ সালে দেশে সিমেন্টের মোট ব্যবহার নেমে এসেছে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টনে, যা শিল্পের মোট উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ শতাংশেরও কম। ২০২৫ সালেও এই চাহিদা আরও কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।










