আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় দুটিই কমেছে। এ সময় অতীতে নেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি।
গতকাল অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও ঋণ পরিশোধের চাপ অব্যাহত থাকবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
ইআরডির তথ্যানুসারে, গত অর্থবছরে ৫২৪ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ছাড় হয় ৮০৭ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৩২ কোটি ডলার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ছাড় হয়েছিল ৮৫৭ কোটি ডলার। সে হিসেবে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি সাড়ে ৩৭ শতাংশ এবং অর্থছাড়ের পরিমাণ ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমেছে।
যদিও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৪ কোটি ডলার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ১ হাজার ২৮ কোটি ডলার ছাড় করা হয়েছিল। গত অর্থবছরে বৈদেশিক সহায়তার সিংহভাগই এসেছে ঋণ হিসেবে। বিপরীতে অনুদানের পরিমাণ ছিল খুবই কম। এ সময় দেশে ২৩ কোটি ডলারের অনুদান ও ৫০১ কোটি ডলারের বিদেশী ঋণ এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বিদেশী অনুদানের চেয়ে ঋণ এসেছে বেশি। সে বছর ৩৮ কোটি ডলার অনুদানের বিপরীতে ঋণ আসে ৭৯৪ কোটি ডলার।
গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি ২৬৮ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ)। প্রায় ৮২ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংস্থাটি। এছাড়া এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ২৫, জাপান ৩১, চীন ২৭, অন্যান্য দাতা দেশ ও সংস্থা থেকে এসেছে ৮৯ কোটি ডলার। তবে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি অন্যতম সহায়তাকারী ভারত ও রাশিয়া।
প্রতিশ্রুতির মতো কমেছে অর্থছাড়ও। শেষ সময়ে এসে বিভিন্ন ঋণ প্রদানকারী দেশ ও সংস্থা তাদের অর্থায়ন বাড়িয়েছিল। প্রায় ৮০৭ কোটি ডলার অর্থ এসেছে গত এক বছরে, যা আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ কম। যদিও সব দেশ ও সংস্থা অর্থছাড় করেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে আইডিএ। বিশ্বব্যাংকের এ সংস্থা ২০৭ কোটি ডলার ছাড় করেছে। এছাড়া এডিবি ১৯১, রাশিয়া ১০৪, এআইআইবি ৬৯, জাপান ৭৯, চীন ৫৩, ভারত ২৭ এবং অন্যান্য দেশ ও সংস্থা থেকে এসেছে ৭৪ কোটি ডলার।
এ বিষয়ে ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, ‘দুই বছর ধরে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ও ছাড় দুটি কমেছে। এর অন্যতম কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিদেশী বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি। এ সময় অনেক দেশের বিনিয়োগের কথা থাকলেও তা আসেনি। আবার রাজনৈতিক সরকার না থাকায় অনেকে বিনিয়োগে আস্থা পায়নি।’
বিদেশী ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমলেও দেনা পরিশোধ করতে হয়েছে অনেক বেশি। আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যা প্রায় ৪০ কোটি ডলার বেশি। গত অর্থবছরে পরিশোধ করা হয়েছে ৪৪৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ২৯৫ কোটি আসল ও ১৫৪ কোটি ডলার সুদ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৬০ কোটি আসল ও ১৪৯ কোটি ডলার সুদ হিসেবে পরিশোধ করতে হয়েছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমার কারণ হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার, এরপর নতুন সরকার—এই ট্রানজিশন পিরিয়ড। এ কারণে পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলোর অর্থছাড়ে সমস্যা হয়েছে। নতুন করে ঋণ নিয়ে নেগোসিয়েশনও করতে সময় লাগে। আরেকটি কারণ হলো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আইএমএফের ঋণের যে কিস্তি পাওয়ার কথা ছিল, সেটাও হয়নি। অন্যদিকে আমাদের ঋণ পরিশোধের চাপ তো ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এটি আরো বাড়বে। কারণ অনেক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে। গ্রেস পিরিয়ডে শুধু সুদ পরিশোধ করতে হয়, কিন্তু রিপেমেন্ট পিরিয়ড শুরু হলে সুদের পাশাপাশি আসলও পরিশোধ করতে হয়। ফলে ডেট সার্ভিসিংয়ের চাপ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাচ্ছে।’









