একই কারণে পাহাড়ে সব ধরনের পানির উৎস থেকে বালি উত্তোলন নিষিদ্ধ। তবে নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় বালি উত্তোলন ও নদী-খাল তীরবর্তী ফসলি জমির মাটি কাটার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে প্রশাসনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে অবৈধ বালি উত্তোলন ও মাটি কাটা থেমে নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অবৈধভাবে কাটা এসব মাটি কক্সবাজারে পাচার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত, তীরবর্তী ফসলি জমি বিলীন, জলজ জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া অতিবর্ষণ ও আকস্মিক বন্যায় প্লাবন ঝুঁকিও বাড়ছে।

সম্প্রতি ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের ফকিরাখোলাপাড়ার বাসিন্দারা বালি উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরজমিনে গিয়ে ওই এলাকায় পরিবেশ বিপর্যয়ের চিত্র দেখা যায়। খালের পশ্চিম পাড়ে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের বনভূমির মাটি ও দক্ষিণ-পূর্ব পাড়ে কৃষকদের ফসলি জমি কেটে মাটি পাচার করা হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, তিন বছর ধরে ৮ থেকে ১২টি ড্রেজার মেশিন দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালি তোলা হচ্ছে। এতে খালের স্বাভাবিক গতিপথ নষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে খালের পাড় ভেঙে প্রায় ৭০ একর ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। বালি তোলার কারণে ফকিরাখোলাপাড়ার ভেতরের একটি সেতু ও বান্দরবান-কক্সবাজার সীমানার হারগাজা খালের ওপর নির্মিত অন্য একটি সেতু দেবে গিয়ে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। এছাড়া গত ২৫ জুলাই রাতে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের ইজারার টোল আদায় চৌকি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় অবৈধ বালি উত্তোলনকারী সিন্ডিকেট। এ বিষয়ে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ওসির কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন টোল ইজারাদার নুরুল আজিম। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার জানানোর পরও স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগ কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় বছরের পর বছর ধরে এসব পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চলছে।

চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের ডুলাহাজারা বিট কর্মকর্তা মো. শহরিয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংরক্ষিত বনের অংশটি ডুলাহাজারা বিট থেকে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের আওতায় নেয়া হয়েছে।’ তবে বন কবে সাফারি পার্কের আওতায় নেয়া হয়েছে তা জানাতে পারেননি তিনি। এদিকে প্রতিদিন নিয়ম করে টহল করা হয় বলে দাবি করেছেন ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল আলম।

সংরক্ষিত বনের সার্বিক বিষয়ে জানতে সরকারি মোবাইলে একাধিকবার কল করেও সংযোগ না পাওয়ায় বক্তব্য মেলেনি বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের উপবন সংরক্ষক আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াসির নেওয়াজের। তবে চাকরিরত থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেড় যুগ আগে ডুলাহাজারা বিটে কর্মরত ছিলেন এমন একাধিক ফরেস্ট অফিসার বণিক বার্তাকে জানান, তাদের সময় হারগাজা খালঘেঁষা ডুলাহাজারা বিটের আওতাভুক্ত সংরক্ষিত বনটি অক্ষত ছিল। সেসময় পাকা সড়ক ও সেতুও ছিল না বলে জানান তারা। তবে সাফারি পার্ক আওতাভুক্ত কোনো এলাকা থেকে বালি তোলা, মাটি কাটাসহ প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন সব ধবনের অপকর্মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বলে জানিয়েছেন বিভাগটির বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা নুর জাহান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এর আগে পার্কের সীমানা প্রাচীরসংলগ্ন এলাকায় এ ধরনের অবৈধ কাজ বন্ধে প্রশাসনের সহায়তায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’ পার্কের আওতাভুক্ত এলাকায় পরিবেশের ক্ষতি করে করা কোনো কাজকে ছাড় দেয়া হবে না বলে জানান তিনি।

এদিকে ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ভিলেজারপাড়া, পাগলীর বিল ও ডুলাহাজারা বাজার এলাকার বাসিন্দারা জানান, বর্ষার দিনে ফকিরাখোলাপাড়া থেকে প্রতিদিন ৩৫-৪৫ ট্রাক বালি কক্সবাজারের দিকে পাচার হয়। আর শীত ও শুষ্ক মৌসুমে প্রতিদিন ২৫০-৩০০ ট্রাক বালি ও মাটি ডুলাহাজারা বাজার হয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

জেলা প্রশাসকের কাছে দেয়া অভিযোগপত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বালি ও মাটি পাচারের এসব অপকর্ম চালাচ্ছে তিনটি সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, বালি ও মাটি পাচার চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পাগলীর বিল এলাকার জসিম উদ্দিন, মো. সাইফুল ইসলাম, ফারুক আহমেদ, আমান উদ্দিন, আরমান, জাবির উদ্দিন, আসিক, মাহিন ও আব্দুল্লাহ।

সরজমিনে দেখা গেছে, ফকিরাখোলাপাড়া থেকে ডুলাহাজারা বাজার আসার পথে পাগলীর বিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পৌঁছার আগে ভিলিজারপাড়ায় সড়কের ডান পাশে একটি ও বিদ্যালয়টি পার হয়ে পাগলীর বিল এলাকায় সড়কের বাম পাশে আরো বড় আকারে বালি মজুদ দেখা গেছে।

নিজস্ব পে-লোডার ও ডাম্প ট্রাক থাকলেও বালি-মাটি উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন সাইফুল ইসলাম। তার দাবি, জয়নাল উদ্দিন ভুট্টো তার পে-লোডার ও ট্রাক ভাড়া নিয়ে চালান। তবে ভুট্টো কোথায় কোন কাজে ব্যবহার করে তা সাইফুলের জানা নেই। একই সঙ্গে প্রতিটি বালি ও মাটির ট্রাক থেকে ভুট্টো ৩০০ টাকা করে চাঁদা নিয়ে বিভিন্ন মহল ম্যানেজ করে বলে জানান তিনি। তিনি আরো জানান, পাগলীর বিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন মজুদ বালির স্তূপও ভুট্টোর। এছাড়া হারগাজা খালঘেঁষা জমির মাটি কাটার কাজ করে বগাছড়ি রহিমের পে-লোডার।

এদিকে সাইফুলের কাছ থেকে কখনই পে-লোডার ও ডাম্পার ভাড়া নেননি বলে জানান জয়নাল উদ্দিন ভুট্টো। তিনি বলেন, ‘সাইফুল মিথ্যা বলেছে।’ ভুট্টো জানান, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের টোল ইজারাদারের পার্টনার হিসেবে তিনি বালি ও মাটির প্রতি ট্রাক থেকে ২০০ টাকাসহ সব ধরনের মাল ও পণ্যবাহী যান থেকে টোল আদায় করেন।

টোল আদায় চৌকি ভেঙে দেয়া ও এ-সংক্রান্ত ইজারাদার নুরুল আজিমের করা অভিযোগের বিষয়ে স্বীকার করেছেন জসিম উদ্দিন। তিনি জানান, তাদের তিন ভাইয়ের পে-লোডার ও ডাম্প ট্রাক রয়েছে। এ কাজে আরো কয়েকজন জড়িত আছেন। এছাড়া হারগাজা খালের ওপর নির্মিত সেতুটি দুই বছর আগে থেকেই দেবে যেতে শুরু করেছে বলে জানান তিনি।

ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. কুতুব উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইউনিয়নের ৩০টির বেশি স্থানে ড্রেজার দিয়ে বালি তোলা হচ্ছে।’

জানা গেছে, জেলার সদর, রুমা, নাইক্ষ্যংছড়ি, থানচি উপজেলার সাঙ্গু নদ ও লামা, আলীকদম উপজেলার মাতামুহুরী নদী তীরের বিভিন্ন স্থানসহ বিভিন্ন ছড়া ও খালসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ড্রেজার দিয়ে নির্বিচারে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন চলছে।

দুই জেলার সীমা হারগাজা খালের বালি, ফসলি জমির মাটি ও কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনের মাটি ডুলাহাজারা বাজার হয়ে পাচার হওয়ার বিষয় জানা নেই বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানাকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলা হবে।’

বান্দরবান জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অবৈধ বালি উত্তোলনসহ পরিবেশ বিধ্বংসী অপকর্মের বিষয় আমাদের নজরে এসেছে। ঘটনাস্থলগুলো হেডকোয়ার্টার থেকে দূরে হওয়ায় পরিকল্পনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এসব নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।’