ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে গোটা সাতক্ষীরা। গাছ চাপা পড়ে শহরের কামালরগনর এলাকার করিমন নেছা (৪০) ও বাকাল এলাকার সামছুর রহমান (৬০) নামে দুই ব্যক্তি মারা গেছে। ভেসে গেছে ১০ সহস্রাধিক মাছের ঘের, ক্ষতি হয়েছে আম ও সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের। গাছপালা উপড়ে অনেক রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ১০ হাজার ২৫৭ টি মাছের ঘের সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে করে ১৭৬ কোটি টাকার চিংড়ি ও সাদা মাছ নষ্ট হয়ে গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক নজরুল ইসলাম জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সাতক্ষীরায় ১৩৭ কোটি টাকার ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১৬ হাজার ২৯৬ টন আমের ক্ষতি হয়েছে, যার মূল্য ৬৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা, সবজি নষ্ট হয়েছে ৩১ হাজার ৮০ টন যার মূল্য ৬২ কোটি ১৬ লাখ টাকা, পান নষ্ট হয়েছে ১০ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং তিল নষ্ট হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
এছাড়া সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর, গবুরা ও আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের কয়েকটি স্পটে কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চাউলখোলা এলাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২০০ ফুটের মত এলাকা ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে।
এছাড়া কামালকাটি ও চন্ডিপুর এলাকায় পানি ওভার ফ্লো হয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকছে। গাবুরা ইউনিয়নের জেলেখানি ও নাপিতখালী এলাকায় বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের সুভদ্রকাটি, কুড়িকাউনিয়া, চাকলা, হিজলা, দিঘলাররাইট, কোলা ভেঙ্গে লোকালয়ে পানি ঢুকছে বলে নিশ্চিত করেছেন আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মীর আলিফ রেজা।
সাতক্ষীরা জেলার প্রায় সব এলাকায় কমবেশি গাছপালা ভেঙে পড়েছে। কিছু কিছু এলাকায় গাছ পড়ে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুতের তারের ওপর গাছ পড়ায় এবং খুটি উপড়ে পড়ায় জেলায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেট পরিসেবা। অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ি ও টিনের চাল উড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী জানান, ঘণ্টায় ১০০-১২০ কিলোমিটার বেগে গতকাল বুধবার বিকাল ৪টার পর থেকে সুন্দরবন উপকূলে আম্পান আছড়ে পড়ে। সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১৪৮ কিলোমিটার গতিবেগে পশ্চিম দিকে ঝড়ো হাওয়াটি জেলা শহরের ওপর আঘাত হানে।
শ্যামনগরের ইউএনও আ.ন.ম আবুজর গিফারী জানান, আম্পানের কারণে নদীর পানি ৩ থেকে ৪ ফুট বৃদ্ধি পেয়ে প্রবল জোয়ারে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের দাঁতনেখালি, দুর্গাবাটি, পদ্মপুকুর ও গাবুরার বেশ কয়েকটি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। কয়েকটি স্থানে বাঁধ উপচে বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কাঁচা ও টিনের ঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে মরিচ্চাপসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ২ থেকে ৩ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ও গাবুরা, মুন্সিগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলার দয়ারঘাট, হাজরাকাটি, কুড়িকাউনিয়া, মনিপুরি ও বিছট এলাকার বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ফাটল দেখা দিয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় আম্পানে জেলায় দুইজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে সাতক্ষীরা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল বাশেদ জানান, জেলার অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। হিসাব হাতে পেলে সাংবাদিকদের জানিয়ে দেয়া হবে।










