তিনি বলেন, ‘তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরামর্শ কমিটি গঠন করতে চাই, যার লক্ষ্য হবে একটি গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা। এ কমিটি সবার মতামতের ভিত্তিতে গঠিত হবে এবং সময় লাগলেও সেটিকে গ্রহণযোগ্য করতে হবে।’
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২৬ উপলক্ষে গতকাল ‘সম্পাদক পরিষদ’ ও ‘নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (নোয়াব) আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বিকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ‘শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন: মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার’ প্রতিপাদ্যে এ বছর দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য দেন নোয়াব সভাপতি ও মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম, সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, সময়ের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ ও সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিম। উপস্থিত ছিলেন আজকের পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসান। সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ এখনো ডিজিটাল সমস্যার পূর্ণ সমাধান করতে পারেনি। তবে অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিছু পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। এক্ষেত্রে সম্মিলিত স্টাডির মাধ্যমে পদক্ষেপ নিতে হবে। সবকিছু বিবেচনায় রাখলে একটি গণমাধ্যম কমিশন প্রয়োজন। সরকার এখানে একটি পক্ষ, কিন্তু অভিভাবক নয়। অতীতে আমরা দেখেছি সরকার নিজেও কখনো কখনো অপরাধ করে। তাই একটি স্বাধীন অথরিটি থাকা দরকার, যা সরকারসহ সব পক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের কাঠামো এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে। আমরা সম্পাদক পরিষদ, নোয়াব, সাংবাদিক নেতৃত্ব এবং অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ে কাজ করতে পারি। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা যেতে পারে। তথ্য মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।’
তিনি বলেন, ‘এবারের মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপন করতে এসে আমাদের সবার—যারা গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করছেন বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—তাদের সবার একটি যাত্রাবিন্দু তৈরি হয়েছে। এ যাত্রাবিন্দুকে দৃশ্যমান করার দায়িত্ব তথ্য মন্ত্রণালয় নিতে আগ্রহী। আমরা কেবল ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে, সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে এটিকে সমন্বয় করতে আগ্রহ ব্যক্ত করছি। আর যারা মূল অংশীদার—বিশেষ করে সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক—সম্মিলিত উদ্যোগ নিলে একটি যাত্রাবিন্দু হতে পারে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল প্লাটফর্মের সমস্যাটি কিছুটা আলাদা। একমাত্র টেক জায়ান্ট ছাড়া অন্য কারো কার্যত তেমন নিয়ন্ত্রণ নেই। আমাদের এখানে বিটিআরসির মতো প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকিরা মূলত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারি, সমালোচনা করতে পারি। বিটিআরসির ক্ষমতাও সীমিত; সর্বোচ্চ কোনো কিছু বন্ধ করা বা বাদ দেয়া। কিন্তু সমস্যাটিকে গঠনমূলক সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়া মূলত টেক জায়ান্টদের ওপর নির্ভর করে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এরই মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমরা আইনবিদদের একটি প্যানেল গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছি। সেখানে বর্তমান সময়ের ডিজিটাল প্লাটফর্ম-সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি ও আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রচলিত আইনগুলো—যেসব দেশে টেক জায়ান্টরা নিবন্ধিত—সবকিছু মিলিয়ে কীভাবে তাদের আমাদের সঙ্গে কাজ করার বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা যায়, সে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরামর্শ কমিটি গঠন করতে চাই, যার লক্ষ্য হবে একটি গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা। এ কমিটি সবার মতামতের ভিত্তিতে গঠিত হবে এবং সময় লাগলেও সেটিকে গ্রহণযোগ্য করতে হবে। যখন একটি গ্রহণযোগ্য কমিশন গঠিত হবে, তখন তার কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি ডিজিটাল প্লাটফর্মকেও এর আওতায় আনার উপায় খোঁজা সম্ভব হবে।’
ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ বলেন, ‘বর্তমান সময়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার যে অবস্থা, বিশেষ করে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার স্বাধীনতা, এর একটি বড় কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একধরনের অসীম স্বাধীনতা ভোগ করে। সেখানে কোনো কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ নেই, ফলে মেইনস্ট্রিম মিডিয়াকে অনেক সময় সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়। তারা কখনই সীমাহীন স্বাধীনতা চায় না এবং সেটি তাদের জন্য বাস্তবসম্মতও নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে আমরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি এবং অনেক সময় পেশাগত ঝুঁকির মধ্যেও পড়ছি। এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার উপায় কী তা নির্ধারণ করা জরুরি।’
সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমরা প্রায়ই বলি বা শুনি—“যুদ্ধের প্রথম শিকার হয় সত্য”। আর অন্যভাবে বলা যায়, সত্য যখন বলা কঠিন হয়ে যায়, কিংবা সত্যের অনুসন্ধান যখন বাধাগ্রস্ত হয়, তখন বুঝতে হবে আমরা একধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই আছি। সোশ্যাল মিডিয়া, অপতথ্য—সব মিলিয়ে আমাদের বর্তমান বাস্তবতা এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সারা বিশ্বজুড়েই চ্যালেঞ্জের মুখে। এ বছর জাতিসংঘের মহাসচিব তার বার্তায় উল্লেখ করেছেন, প্রায় ৮৫ শতাংশ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত বা বিচার হয় না। এটি বিশ্বের অন্যতম বড় ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তির উদাহরণ। এ প্রেক্ষাপটে আমাদের নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, যারা তথ্য সংগ্রহ করেন এবং জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দেন, তাদের নিরাপত্তার দিকে আরো বেশি নজর দেয়া হবে।’
ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, প্রেস ফ্রিডম মানে শুধু আইনগত বাধা না থাকা নয়। শুধু মামলা-মোকদ্দমার ভয় না থাকলেই স্বাধীনতা সম্পূর্ণ হয় না। এর পাশাপাশি একটি সামগ্রিক পরিবেশ দরকার, যা শুধু সরকার নয়, সব স্টেকহোল্ডার মিলে তৈরি করে। সেই পরিবেশ হতে হবে এমন, যেখানে ভয় বা চাপ ছাড়া নির্ভয়ে, স্বাধীনভাবে, সুষ্ঠু সাংবাদিকতা করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ হবে আরো ভালো কনটেন্ট তৈরি করা, আরো দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করা, যাতে ভুয়া তথ্যের ভিড়ে সত্য তথ্য টিকে থাকে। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক তথ্য আসে, কিন্তু তার সবই সত্য নয়। অনেক সময় মানুষ বিভ্রান্ত হয়, ভুল তথ্যের শিকার হয়। এ পরিস্থিতিতে আমাদের দায়িত্ব আরো বেড়ে যায়—আমরা যারা নিজেদের সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে দেখি, আমাদের কাজ হলো আরো বেশি গুণগত সাংবাদিকতা করা।’
ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন বলেন, ‘আমরা এখন বিশ্ব পরিস্থিতি দেখলে বুঝতে পারি, প্রেস ফ্রিডম বা গণমাধ্যমের অবস্থান বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা অন্যান্য দেশ—সবাই সমানভাবে ভালো অবস্থায় নেই। যুদ্ধ, বিশেষ করে ফিলিস্তিনের পরিস্থিতির মতো ঘটনাগুলো গণমাধ্যমের ওপরও প্রভাব ফেলছে। সুতরাং বলা যায়, কেউই সম্পূর্ণ ভালো অবস্থায় নেই।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বিগত সরকারের সময় এবং বর্তমান সময়—দুই অবস্থার মধ্যেই আমরা বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি। বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র দুই মাস। এখন পর্যন্ত আমরা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় আছি বলেই মনে করি।’
সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিম বলেন, ‘সরকার পদক্ষেপ নিতে গেলে আমাদের মধ্যেও একটি আশঙ্কা কাজ করে—অপতথ্য ঠেকাতে গিয়ে যেন তথ্যপ্রবাহই বাধাগ্রস্ত না হয়। আমরা চাই না, অপতথ্য রোধের নামে সত্য তথ্যও আটকে যাক। আমরা আশা করব, নতুন সরকার সংবাদমাধ্যমের সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং সমাধানের উদ্যোগ নেবে, যাতে মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির পথে কোনো বাধা তৈরি না হয়।’










