কম খরচে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষিপণ্য পৌঁছে দিতে বিশেষ ট্রেন চালু করেছে রেলওয়ে। গতকাল সকাল সোয়া ১০টায় খুলনা রেলওয়ে স্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেছে ট্রেনটি। বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে যশোর স্টেশনে ট্রেনটি পৌঁছানোর কথা থাকলেও ৪০ মিনিট বিলম্বে পৌঁছায়। তবে প্রথম দিনে কৃষিপণ্য ছাড়াই যশোর ছেড়ে গেছে বিশেষ ট্রেন। কৃষক বলছেন, বিশেষ এ ট্রেনের খবর তারা জানেন না।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দিন খুলনা থেকে সাতটি বগিতে ৬৪০ কেজি পণ্য নিয়ে ছেড়ে গেছে বিশেষ ট্রেন। এখন থেকে মঙ্গলবার খুলনা, বৃহস্পতিবার পঞ্চগড় ও শনিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকায় কৃষিপণ্য নিয়ে যাতায়াত করবে ট্রেনটি। প্রতিদিন ১২০ টন পণ্য আনা-নেয়ার সুবিধা মিলবে। প্রতি কেজি সবজি ও কৃষিপণ্য বহনে খরচ পড়বে ১ টাকা ৮ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৪৭ পয়সা।

বাংলাদেশ রেলওয়ের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (পশ্চিম) সুজিত কুমার বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখতে সম্প্রতি চীন থেকে আনা আধুনিক কোচ সংযুক্ত করা হয়েছে। এ ট্রেনে থাকছে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বগিও যা যাত্রাপথে যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়াসহ ১৫টি স্টেশন থেকে পণ্য নেবে।’

দেশের চাহিদার সিংহভাগ শীতকালীন সবজি সরবরাহ করেন যশোরের চাষীরা। তবে প্রচারণার অভাবে প্রথম দিনে বিশেষ ট্রেনে সবজি সরবরাহ করতে পারেননি। অবশ্য রেলওয়ে স্টেশন মাস্টারের দাবি, এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালালেও আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। আগামীতে সাড়া পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী তারা।

বিশেষ ট্রেনের বিষয়ে কথা হয় সদর উপজেলার ছোট হৈবতপুর গ্রামের সবজি চাষী আব্দুল আলিমের সঙ্গে। এ সময় তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনার কাছেই প্রথম শুনলাম ট্রেনের কথা। কবে থেকে চালু হবে বা হয়েছে, জানি না। ট্রেনটি মুন্সি মেহেরুল্লাহ স্টেশনে থামলে আমাদের জন্য ভালো হয়। এখান থেকে ট্রেনে পণ্য পরিবহন করতে পারলে আমাদের সুবিধা।’

ট্রেনের বিষয়টি জানেন না বারীনগর সাতমাইল হাটের আড়তদার আতিয়ার রহমানও। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সবজি পরিবহনের বিশেষ ট্রেন চালুর বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছেই শুনলাম। অবশ্য আমাদের আড়ত থেকে সবজি পাঠানোর জন্য ট্রাকই সুবিধাজনক। কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য আমাদের আড়তে দিয়ে যান। আর ট্রাক একদম আড়তের সামনে দাঁড়িয়ে লোড করতে পারে। এতে আমাদের সুবিধা। রেলওয়ে স্টেশনে যাওয়া আমাদের জন্য কষ্টকর। যদিও ট্রেনে সবজি পাঠাতে পারলে আমরা আর্থিকভাবে লাভবান হব।

যশোর রেলওয়ে স্টেশন ছাড়ার পর মুন্সী মেহেরুল্লাহ স্টেশনে সবজি ট্রেনটি থামার কথা। তবে সেখানে সবজি দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন সাংবাদিক তারিক হাসান। পরের স্টেশন ঝিনাইদহের বারবাজার। ওই অঞ্চলের সবজি চাষী বা ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনে এটি সুবিধাজনক।

বারবাজার রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘বেলা ১২টা ২০ মিনিটে বারবাজার স্টেশন পার হয়েছে বিশেষ ট্রেনটি। তবে এ স্টেশন থেকে সবজি ওঠেনি।’ মুন্সী মেহেরুল্লাহ স্টেশন থেকে উঠেছে কিনা জানেন না তিনি।

যশোর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার আয়নাল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সবজিবাহী বিশেষ এ ট্রেন প্রতি মঙ্গলবার চলাচল করবে। এজন্য ব্যবসায়ী পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগকেও নতুন সার্ভিস সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু প্রথম দিন হিসেবে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। তবে আগামীতে সাড়া পাওয়া যাবে।’

এ বিষয়ে কথা হয় যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সুশান্ত তলরদারের সঙ্গে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সবজি পরিবহনে বিশেষ ট্রেনের খবর আমরা জানি। সম্প্রতি যশোর সদরের আব্দুলপুর গ্রামের সবজিচাষীদের নিয়ে একটি প্রশিক্ষণে এ ব্যাপারে কথা হয়েছিল। তারা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। যেহেতু ট্রেনে পণ্য পাঠাতে খরচ কম, সে কারণে কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।’

ট্রেনের অত্যাধুনিক লাগেজ ভ্যানে ফল ও সবজি পরিবহন করা যাবে। এছাড়া রেফ্রিজারেটেড লাগেজ ভ্যানে হিমায়িত পণ্য মাছ, মাংস ও দুধ পরিবহন করা হবে। বিশেষ ট্রেনটি সকাল সোয়া ১০টায় খুলনা থেকে ছেড়ে বেলা ২টার পর চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশনে পৌঁছায়। সেখান থেকে ১০০ কেজি পটোল ও ঢেঁড়শ নিয়ে চুয়াডাঙ্গা ছাড়ে। রাত সাড়ে ১০টার পর ট্রেনটির ঢাকার তেজগাঁওয়ে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলী বলেন, ‘রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বেচাকেনার সময় বিবেচনা করে রাতে পৌঁছাবে ট্রেন। চাহিদা বাড়লে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হবে।’

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, দেশের ১৫টি কৃষি অঞ্চল থেকে পণ্য পরিবহন করবে রেলওয়ে। তিনটি স্পেশাল ট্রেনের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় সবজি, ফলমূল, মাছ ও ডিম সরবরাহ করা হবে। এছাড়া খুলনা, রাজশাহী ও পঞ্চগড় থেকে সপ্তাহে একদিন চলবে বিশেষ এ ট্রেন। এতে একদিকে যেমন মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদারের দৌরাত্ম্য কমবে, অন্যদিকে কমবে দামও। একই সঙ্গে রাজধানীবাসী পাবেন টাটকা সবজি।

যদিও এর আগে ২০২১ সালে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সেটা আলোর মুখ দেখেনি। লাভজনক না হলেও আম ও গরু পরিবহনে চলাচল করে বিশেষ ট্রেন।