বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং ওই প্রতিবন্ধকতাগুলো নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।
গতকাল রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় গবেষণার পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন গবেষণার নেতৃত্ব দানকারী সাবেক জেলা ও দায়রা জজ উম্মে কুলসুম। ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা (সেলপ) কর্মসূচির উদ্যোগে এ পরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা নিষ্পত্তির গড় সময়সীমা ৩ বছর ৭ মাস। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে। দুর্বল তদন্ত ও সাক্ষ্য ব্যবস্থা, মেডিকেল ও ডিএনএ রিপোর্টে বিলম্ব, নিম্নমানের বা অসম্পূর্ণ তদন্ত, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাবসহ কাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গবেষণার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে উম্মে কুলসুম বলেন, ‘গবেষণায় দেশের ৩২টি জেলার ৪২টি ট্রাইব্যুনালে জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব মামলার সময়সীমা, মুলতবি সংখ্যা, সময় আবেদনের পুনরাবৃত্তি, মামলার ধরন, সাক্ষী ও অভিযুক্তের তথ্য, ফরেনসিক পরীক্ষা ও রায়ের ধরন অনুযায়ী এ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহর সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় বাজেটে বিচার বিভাগের বরাদ্দ প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সেখানে শুধু বিটিভির জন্য বরাদ্দ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা; যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দও এর চেয়ে বেশি। এ বরাদ্দ দিয়ে বিচারকদের বেতন, প্রশাসনিক ব্যয় ও অবকাঠামো পরিচালনা চ্যালেঞ্জিং।’
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, একজন বিচারক সাক্ষীর জবানবন্দি লিখতে গিয়ে কাগজ শেষ হয়ে গেলে নিজে থেকে কাগজ কেনার ক্ষমতাও রাখেন না। নতুন কাগজ পেতে প্রশাসনিক অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়, ফলে মামলার নতুন তারিখ দিতে বাধ্য হতে হয়। মামলা জটে পুলিশ বা চিকিৎসকদের দায়ী না করে বিচারকদেরও ‘জুডিশিয়াল অ্যাক্টিভিজম’ দেখাতে হবে। অনেক আইনজীবী মামলা দীর্ঘায়িত করে ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করেন। বিচারিক দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো বিচারক চাপের মুখে পড়লে সরকার তার পাশে থাকবে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিপ্রায়ে দীর্ঘ ১০ বছর পর আলোচিত তনু হত্যা মামলার তদন্তের জট খুলতে শুরু করেছে বলে জানিয়ে আইনমন্ত্রী আরো বলেন, এ মামলার তদন্ত অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে প্রধানমন্ত্রী ঈদের দিন আমাকে ফোনে মেসেজ (বার্তা) পাঠান। সে অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে তাকে বিস্তারিত জানানো হয়। এরই মধ্যে একজন আসামিকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে মামলার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। বিষয়টি বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত হিসেবে বিবেচিত হলেও আইন মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ ১০ বছরেও যে কাজগুলো করা হয়নি, সেগুলোর অনেকগুলোই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা দ্রুত সম্পন্নের উদ্যোগ নিয়েছি। এক-দুই মাসের মধ্যেই এসব বাস্তবায়ন করা হবে।’
ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে এক বিচারপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এ ধরনের অভিযোগ তদন্তের বিষয়টি সরকারের নয়, বরং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এটা দেখবে।
এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের বিষয় না। কারণ এটা সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির বিষয়ে যদি মিসকন্ডাক্টের অভিযোগ আসে, সেটা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল দেখবে। আইন মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনো রকম কর্তব্য, দায়িত্ব, সম্পৃক্ততা নেই।
নারীর ওপর সহিংসতার প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনাই সামাজিক কাঠামো, কলঙ্ক, ভয় ও মানসিকতার কারণে আদালত পর্যন্ত আসে না বলে মন্তব্য করেছেন আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন। তিনি বলেন, কম সাজার হার দেখে অনেকেই এসব মামলাকে ‘মিথ্যা’ মনে করেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হন। প্রতিকার ও প্রতিরোধ আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়। বরং অনুসন্ধান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কার্যকর আইন প্রণয়নের দাবি উঠে আসে সেলপের গবেষণা প্রতিবেদনের আলোচনায়।










