প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সরকারের আর্থিক প্রাক্কলনের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য বা মিসম্যাচ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ড. জুবায়ের আহমেদ। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি বিষয়ে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বুধবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইআরএফ মিলনায়তনে ‘প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট: উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সেমিনারের আয়োজন করে ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট।

অনুষ্ঠানে আরো ছিলেন ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. জুলফিকার হাসান, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মিজানুর রহমান এবং স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকস, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ডিন অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম।

প্রবন্ধে ড. জুবায়ের আহমেদ বাজেটের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যতা, উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে এর ভূমিকা বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমেছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ বাস্তবসম্মত নয় বলেই মনে হচ্ছে।

ড. জুবায়ের আহমেদ বলেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ একটি ম্যাক্রো-ইকোনমিক কন্ট্রাডিকশন বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের উদাহরণ। কারণ প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সাধারণত সম্প্রসারণমূলক নীতি প্রয়োজন হয়, যা আবার মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

প্রবন্ধে প্রস্তাবিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকেও অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তিনি বলেন, বিদ্যমান কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কর-জিডিপি অনুপাত ৯ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও অতীতের অভিজ্ঞতা এ লক্ষ্য অর্জনের পক্ষে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কম দেয়।

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিটি অর্থবছরেই এনবিআরের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ছিল। প্রতিবছর ঘাটতির পরিমাণও বেড়েছে। ফলে কার্যকর সংস্কার ছাড়া নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।

ড. জুবায়ের আহমেদ বলেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে আগামী বছরগুলোতে সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিবর্তে বৈদেশিক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে চায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা থাকলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা কমিয়ে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিপরীতে বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এনবিআরের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, বিদেশি অর্থায়ন প্রাপ্তির জটিলতা এবং বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর অর্থ ছাড়ে ধীরগতির কারণে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

প্রবন্ধে আরো বলা হয়, দেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এখনো তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। পাশাপাশি জিডিপির তুলনায় সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। এ বাস্তবতায় অর্থনীতির প্রকৃত সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বাজেটের কিছু ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেন ড. জুবায়ের। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রবণতা ইতিবাচক। এসব উদ্যোগ ২০৪১ সালের রূপকল্প ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে।

তিনি বলেন, উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রশংসনীয় হলেও পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত না করে শুধু ঋণনির্ভর বড় বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের শর্ত ও ভবিষ্যৎ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা সৃষ্টি করতে পারে।

সেমিনারে উপস্থিত বিশ্লেষকরাও মত দেন, বাস্তবসম্মত সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া বাজেটের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সাধারণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করা এবং প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা আগামী অর্থবছরে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হবে।