অস্থিতিশীল রয়েছে জ্বালানির বাজার। ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হারও নিম্নমুখী। সব মিলিয়ে আমদানিতে আরো বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে জাপানকে। এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। এ নিয়ে আগস্টে টানা ১৪তম মাসের মতো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির রফতানি ও আমদানি বাণিজ্যের ব্যবধান ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। গতকাল প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

জাপানভিত্তিক কিয়োদো নিউজের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে জাপানের বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড ১১ লাখ কোটি ইয়েনে (৭ হাজার ৩০০ কোটি ডলার) উন্নীত হয়েছে। উচ্চ জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম দেশটির আমদানি বাড়িয়ে তুলেছে। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে ইয়েনের অবমূল্যায়ন বাণিজ্য ঘাটতি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

দেশটির এ বাণিজ্য ঘাটতি তুলনামূলক তথ্য পাওয়ার পর ১৯৭৬ সালের পর সর্বোচ্চ। রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতি জাপানের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার চিত্র তুলে ধরেছে। এর আগে অর্থবছরের ছয় মাসে রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২০১৩ সালের অক্টোবর-মার্চ সময়ে ৮ লাখ ৭৬ হাজার কোটি ইয়েন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া ছয় মাসে আমদানি ব্যয় ৬০ লাখ ৫৮ হাজার কোটি ইয়েনে উন্নীত হয়েছে। এ আমদানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। আমদানি ব্যয়ে উল্লম্ফন দেখা দিলেও তার সঙ্গে সংগতি রেখে বাড়েনি রফতানি আয়। এ সময়ে অর্থের হিসাবে রফতানি ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার কোটি ইয়েনে পৌঁছেছে। যদিও রফতানি আয়ের এ পরিমাণও রেকর্ড সর্বোচ্চ।

দেশটির প্রধান রফতানির মধ্যে রয়েছে গাড়ি ও সেমিকন্ডাক্টর। পাশাপাশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মেইজি ইয়াসুদা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইউইচ কোদামা বলেন, উচ্চ জ্বালানির দাম ও দুর্বল ইয়েন জাপানের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়ে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে দুর্বল ইয়েন জাপানের রফতানি আয় বাড়াতেও সহায়তা করছে। এটি দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনও (জিডিপি) বাড়িয়ে তুলবে।

ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও অন্য জ্বালানির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। কেবল সেপ্টেম্বরেই বাণিজ্য ঘাটতি ২ লাখ ৯ হাজার কোটি ইয়েনে উন্নীত হয়েছে। ডলারের বিপরীতে ইয়েনের অবমূল্যায়নের কারণ হিসেবে ব্যাংক অব জাপানের মুদ্রানীতি সহজীকরণকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে কভিডের বিপর্যয় কাটিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সুদের হার কম থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও এটি রফতানিকারকদের জন্য উচ্চ মুনাফার সুযোগ করে দিয়েছে। চলতি বছর ডলারের দাম ৩০ ইয়েনের বেশি বেড়েছে।

এপ্রিল-সেপ্টেম্বর সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের বাণিজ্য ব্যবধান উদ্বৃত্ত ছিল। এ সময়ে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে টোকিওর বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ৩ লাখ ১৬ হাজার কোটি ইয়েনে উন্নীত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি ও যন্ত্রপাতির চালান বৃদ্ধি এ বাণিজ্য উদ্বৃত্তে সহায়তা করেছে। এ সময়ে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ২ লাখ ৮৪ হাজার কোটি ইয়েনে পৌঁছেছে। এ ঘাটতি গত বছরের একই সময়ের ৯৮ হাজার ১৪৯ কোটি ইয়েনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। দেশটির সঙ্গে রফতানি ও আমদানি উভয়ই রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে জাপানি জামাকাপড়, স্মার্টফোন ও ব্যক্তিগত কম্পিউটারের রফতানি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। চীনা পণ্যের আমদানি ২৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১২ লাখ ৫৫ হাজার কোটি ইয়েনে দাঁড়িয়েছে। যেখানে রফতানি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৯ লাখ ৭১ হাজার কোটি ইয়েনে। এশিয়ার বাকি অংশের সঙ্গে জাপানের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি ইয়েন। যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৮৭ হাজার ৬৫৫ কোটি ইয়েন।

জাপানের রফতানি বৃদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গিও অনিশ্চিত রয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।