কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিদ্যুতায়ন ও আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তারে বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা বাড়ছে। এসব খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দুই পরাশক্তি। ফলে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশে খনি খাতে বাড়ছে বড় অংকের বিনিয়োগ। এর মধ্যে আছে কঙ্গো, ব্রাজিল ও কাজাখস্তান। এতে খনিজ সম্পদনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোয় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সে সম্ভাবনা কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করছে খনিজ উত্তোলন বাড়ানোর সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর। খবর দি ইকোনমিস্ট।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে খনিজ সম্পদের গুরুত্ব নতুন নয়। বিশেষ করে যেসব দেশের শিল্প ও সেবা খাত তুলনামূলক কম উন্নত, সেসব দেশের অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের ভূমিকা অনেক বেশি। তেল, তামা, লিথিয়াম, কোবাল্ট ও বিরল মৃত্তিকা মৌলের মতো খনিজের চাহিদা বাড়লে এসব দেশের রফতানি আয় ও সরকারি রাজস্ব বাড়ে। একই সঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগও আকৃষ্ট হয়।

অতীতে চীনের দ্রুত শিল্পায়ন ও বিপুল কাঁচামালের চাহিদা বিশ্ববাজারে ধাতু ও জ্বালানির দাম বাড়িয়েছিল। ওই সময় পণ্যবাজারে বড় ধরনের উত্থান বা কমোডিটি সুপারসাইকেল তৈরি হয়। এর সুফল পায় অনেক উন্নয়নশীল দেশ। উদাহরণ হিসেবে অ্যাঙ্গোলার কথা উল্লেখ আছে প্রতিবেদনে। তেল বিক্রির আয় বাড়ায় ২০০২-০৮ সালের মধ্যে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় প্রায় দ্বিগুণ।

এবার বিশ্ব অর্থনীতিতে আরেকটি কমোডিটি সুপারসাইকেলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন পণ্যবাজার বিশ্লেষকরা। তবে এবার এর চালিকাশক্তি শুধু চীনের শিল্পায়ন নয়। বরং এআই, বিদ্যুতায়ন ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ চাহিদা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা।

বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত অস্ত্র, ইভি, ব্যাটারি ও জ্বালানিপ্রযুক্তি তৈরিতে প্রয়োজন বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ। এসব খনিজ সরবরাহে দীর্ঘদিন ধরে চীনের প্রভাব রয়েছে। এ নির্ভরতা কমাতে এখন বিকল্প উৎস খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্রও। অন্যদিকে বিদেশে খনি ও খনিজ প্রক্রিয়াকরণ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করছে চীনও।

২০০০ সাল থেকে অন্তত ১৯টি দেশের সঙ্গে খনিজ সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন চুক্তি করেছে চীন। অন্যদিকে একই সময় ২০টির বেশি দেশের সঙ্গে খনিজ খাতসংশ্লিষ্ট চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্রও। ফলে দুই পরাশক্তির বিনিয়োগের কেন্দ্র হয়ে উঠছে অল্প কয়েকটি দেশ, যাদের খনিজ সম্পদ রয়েছে এবং তুলনামূলক কম সময়ে সেখান থেকে উত্তোলন বাড়ানো সম্ভব।

বিশ্বব্যাংক গত ১৬ অক্টোবর জানায়, খনিজ সম্পদের বাড়তি চাহিদা থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলো যাতে সুফল পেতে পারে, সেজন্য একটি তহবিলের আকার পাঁচ গুণ বাড়িয়ে ২ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করা হবে। তবে শুধু খনিজ সম্পদ থাকলেই এ সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব নয়। খনিজ উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ ও সরবরাহের সক্ষমতাও থাকতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত উৎপাদনে যাওয়ার মতো অবকাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, খনিজ সরবরাহের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে চীনের পণ্যের ওপর আরোপ করা শুল্ক কমাতে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের জবাবে সেমিকন্ডাক্টর ও অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত সাত ধরনের বিরল মৃত্তিকা মৌল রফতানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল চীন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও প্রতিরক্ষা খাতে এসব খনিজ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

এরপর চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় ওয়াশিংটন। গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মজুদ গড়ে তোলা, উৎপাদকদের জন্য ন্যূনতম দাম নিশ্চিত করা এবং খনি প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের ঘোষণা দেয় মার্কিন সরকার।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের খনিজ প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো)। দেশটিতে টিন, হীরা, তামা, কোবাল্ট ও অন্যান্য খনিজের বড় মজুদ রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা একসময় দেশটির খনি খাত থেকে সরে গিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজের দাম কমে যাওয়ার পর চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম দামে বেশকিছু খনির সম্পদ কিনে নেয়।

চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দেশটিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। একটি তামার খনি সম্প্রসারণে ১০০ কোটি ডলার খরচের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন। পাশাপাশি বছরে পাঁচ লাখ টন পর্যন্ত তামা উৎপাদনে সক্ষম আরেকটি বড় খনি প্রকল্প গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয়া হয়ছে। এদিকে কঙ্গোর খনিজ খাতে ফিরছে যুক্তরাষ্ট্রও। দেশটির শেষ কয়েকটি পশ্চিমা মালিকানাধীন চালু খনির একটি কিনে নিতে আলোচনা করছে দেশটি।

এদিকে ব্রাজিল ও কাজাখস্তানের খনিজ খাতে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ছে। ব্রাজিলে বিরল মৃত্তিকা মৌলের খনি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ যুক্তরাষ্ট্রের। গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের খনি কোম্পানি ইউএসএ রেয়ার আর্থ ব্রাজিলের সেররা ভার্দে গ্রুপ অধিগ্রহণ করে। প্রতিষ্ঠানটির এ উদ্যোগে মার্কিন সরকারেরও অংশীদারত্ব ও আর্থিক সহায়তা রয়েছে। এশিয়ার বাইরে বিরল মৃত্তিকা মৌলের চারটি অত্যন্ত দুর্লভ উপাদান উৎপাদনকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান এটি। খনিটি অধিগ্রহণে প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে ২৮০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে।

অন্যদিকে মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখস্তানে টাংস্টেন খনিজের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের। আধুনিক অস্ত্র ও উচ্চ প্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে এ খনিজ গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের নভেম্বরে কাজ রিসোর্সেস নামের একটি প্রতিষ্ঠান কাইরাকতি ও নর্দার্ন কাতপার অঞ্চলের টাংস্টেন মজুদ উন্নয়নে ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা জানায়। প্রতিষ্ঠানটির পেছনে ট্রাম্প প্রশাসন ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের দুই ছেলে এরিক ট্রাম্প ও ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের মতো বিনিয়োগকারীদের সমর্থন রয়েছে।